পঞ্চগড়ে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি না থাকায় সীমাহীন ভোগান্তিতে দুই লক্ষ গ্রাহক


মোঃ কামরুল ইসলাম কামু পঞ্চগড় প্রতিনিধিঃ
 

পঞ্চগড়ে জোনাল অফিস নিয়ে ১৯৮৫ সালে যাত্রা শুরু করে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। একটি পৃথক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি হওয়ার জন্য গ্রাহক সংখ্যা সহ অন্যান্য যে ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন তার সব কিছুই পঞ্চগড় জোনাল অফিস অতিক্রম করেছে। দীর্ঘ দিনেও পঞ্চগড়ে পৃথক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি গঠন না হওয়ায় বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়া,ট্রান্সমিটার ক্রয়,বৈদ্যুতিক খুঁটি ক্রয় সহ নানা কাজে গ্রাহকদের যেতে হচ্ছে পাশ^বর্তী জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে। যে কোন ধরনের কাজে দিনের পর দিন ঠাকুরগাঁওয়ে ঘোরাঘুরি করে কাঙ্খিত সেবা না পেয়ে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। 

পঞ্চগড় জোনাল অফিসে ২ লক্ষাধিক  গ্রাহক সংখ্যা হলেও পৃথক কোন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি গঠন করা হয়নি। গ্রাহকদের ছোট খাট কাজেও যেতে হচ্ছে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি অফিসে। এতে গ্রাহক ভোগান্তি বাড়ছে তেমনি কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রাহকরা। জেলায় পল্লী বিদ্যুৎ এর সঞ্চালন লাইনের পরিধি দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৪ শত ৮ কিলোমিটার। এত বড় সঞ্চালন লাইন পরিচালনা করতে গিয়ে নানা ধরনের ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। ফলে তা মেরামত করতে হলে পঞ্চগড় জোনাল অফিসকে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে জানাতে হয়। সেখান থেকে অনুমোদন হলে তারা ঠিকাদারের লোকজন পাঠিয়ে ত্রুটি মেরামত করেন। এতে যেমন ৩-৪ দিন লেগে যায় এবং গ্রাহকদেরও বিদ্যুৎ হীন অবস্থায় থাকতে হয়। 

পঞ্চগড় জেলা আয়তন ১৪০৬ বর্গ কিলোমিটার। ৫টি উপজেলা আর ৩টি  পৌরসভার ১ হাজার ৩৪ টি গ্রামে পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহক সংখ্যা বর্তমানে ২ লক্ষ ৪ হাজার ২শত জন। এর মধ্যে আবাসিক সংযোগ ১ লক্ষ ৮৩ হাজার ৭১৫ টি, বানিজ্যিক সংযোগ ১০ হাজার ৮৩৬ টি, সেচপাম্প সংযোগ ৫ হাজার ৫০৭ টি, শিল্প সংযোগ ১ হাজার ৭৪ টি এবং অন্যান্য সংযোগ ৩ হাজার ৬৮টি। এত বড় পরিধির এই বিদ্যুৎ লাইন পরিচালনার জন্য যে লোকবল প্রয়োজন জোনাল অফিস হওয়ার কারণে সে পরিমান লোকবল এখানে নাই। ফলে গ্রাহকেরা তাদের কাঙ্খিত সেবাও পাচ্ছে না। যেখানে মাত্র ৩৫ হাজার গ্রাহক নিয়ে একটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি গঠনের নিয়ম রয়েছে সেখানে দীর্ঘ ৩৫ বছরেও পঞ্চগড়ে আলাদা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি হয়নি। জেলার পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহকদের দাবি পঞ্চগড়ে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি গঠন করে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ভোগান্তি ও হয়রানী বন্ধ করা ।

জেলার সদর উপজেলার গড়িনাবাড়ি ইউনিয়নের কৈরা পাড়া এলাকার চালকল মালিক আনিসুর রহমান এ তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা  ক্ষোভের সাথে বলেন, আমি একটি চালকলের আবেদন করি পল্লী বিদ্যুৎ এর পঞ্চগড় জোনাল অফিসে। সেখানে তারা আমার মিলের প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে পাঠানো হয়। পরে সেখান থেকে ইঞ্জিনিয়ার আসে আমার লোকেশন দেখতে। এরপরে আমাকে মিলের সংযোগ ও ট্রান্সমিটার ক্রয় বাবদ টাকা জমা দিতে বলা হয়। পরে আমি এ ব্যাপারে ৪/৫ বার সেখানে গিয়ে নানা টেবিলে ঘোরাঘুরি করে হয়রানীর শিকার হওয়ার দীর্ঘদিন পরে অনেক অনুরোধের পর সংযোগ পাই।

জেলার বোদা উপজেলার বেংহারী ইউনিয়নের ধনীপাড়া এলাকার সেচপাম্প গ্রাহক মাহাবুব আলী জানান,আমি সেচপাম্প নেয়ার জন্য আবেদন করি। পরে সেখানে তিনদফায় জামানতের টাকা,পাম্পের টাকা ও ট্রান্সমিটারের টাকা জমা দেয়ার জন্য ঠাকুরগাঁও যাই। এরপরে সংযোগ নিতে নানা টেবিলে ফাইল চালাচালির পর ভোগান্তি ও হয়রানী শেষে সংযোগ পাই। পঞ্চগড়ে যদি আলাদা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি হয় তাহলে আমাদের আর এ ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হবেনা।

একই উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ এ গ্রাহক তোজাম্মেল হোসেন বলেন,আমি আমার বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য পঞ্চগড়ে আবেদনের প্রেক্ষিতে সংযোগ পেতে দেরী হলে  ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে যাই। সেখানে অফিসের অনেক অফিসারের টেবিলে এই রুম থেকে ওই রুমে যাই। তাও সংযোগের কোন সুরাহা হয়নি। আমি একটি স্কুলে চাকরি করি। স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে বেশকয়েকবার ঠাকুরগাঁও যাই। এভাবে আর কত দৌড়াবো বলতে পারেন। এ ভোগান্তির শেষ কোথায় আপনাদের মাধ্যেমে আমি জানতে চাই।

তবে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় পঞ্চগড় জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মেহেদী হাসান এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, আমার অফিস থেকে কোন গ্রাহক কোন ধরনের ভোগান্তী,হয়রানী কিংবা নাগরিক সেবা থেকে  বঞ্চিত হচ্ছেন না। আমরা তাদের সব ধরনের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। তারা কেন যাচ্ছেন তা আমি জানিনা। তারা হয়তো এখানের থেকে বেশী সেবা পাবার জন্য ঠাকুরগাঁওয়ে যাচ্ছেন। 

পঞ্চগড়-০২ আসনের সাংসদ রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, পঞ্চগড়ে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি গঠনের সকল যোগ্যতা অতিক্রম করেছে পঞ্চগড় জেলা। জেলার বিদ্যুৎ গ্রাহকদের সহজে বিদ্যুৎ প্রাপ্তি এবং হয়রানী মুক্ত সেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে পঞ্চগড়ে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি গঠন করা প্রয়োজন। অচিরেই পঞ্চগড়ে পৃথক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি গঠনের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের সাথে বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা বলেও জানান তিনি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য