সংসারের আশায় সাগর ফাড়ি দিয়ে লাশ হয়ে ফিরল ১৫ রোহিঙ্গা, উদ্ধার ৭২, নিখোঁজ ৬৫ (ভিডিও)

 সংসারের আশায় সাগর ফাড়ি দিয়ে লাশ হয়ে ফিরল রোহিঙ্গা ১১ নারী ও ৪ শিশু সহ ১৫ জন, উদ্ধার ৭২ নিখোঁজ ৬৫

উদ্ধারকৃত রোহিঙ্গা লাশের দৃশ্য।

মোঃ মনছুর আলম (এম আলম):
কক্সবাজার জেলার টেকনাফে বঙ্গোপসাগর উপকূলের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া পাচারকারী দালাল চক্র ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গেল কয়েক বছর প্রশাসনের অভিযানে সাগর পথে মালয়েশিয়ায় মানব পাচার থেমে গেলেও চলতি শীত মৌসুমে একাধিক মালয়েশিয়াগামী টিমকে আটক করেছে আইনশৃংখলা বাহিনী। তাদের মধ্যে অনেকে নিজ স্বামী ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে ও অনেকে নারী বিয়ের উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মালয়েশিয়ায় একদল রোহিঙ্গা যুবকের বিয়ের প্রলোভনে পড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিচ্ছিলেন তারা। 


ইছমত আরা বলেন, আমার অনেক আত্মীয় এর আগে মালয়েশিয়া গিয়েছে। কিন্তু তাদের সঙ্গে তেমন কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের তুলাতুলি এলাকার অলি আহম্মদ (৩৫) বোটা মিয়া (২২), জসিম (২৮), জহির আহম্মদ, বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালী পাড়া এলাকার ইলিয়াছ মেম্বারের কাছে মালয়েশিয়া বসবাসরত এক আত্নীয় মাধ্যমে এই দালালদের কাছে যাই। আমিসহ ৩০-৪০ জন নারী-শিশুসহ কয়েকজন পুরুষও ছিল। এদের মাধ্যমে ১০ ফেব্রুয়ারি রাত দের টার দিকে ট্রলারে উঠি। এর পর সেন্টমাটিন দ্বীপের কাছাকাছি গেলে ট্রলারটি ঢুবে যায়। 

এঘটনায় ১৫ জনের লাশ উদ্ধার ও ৭২ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে কোস্টগার্ড। নিহতের মধ্যে ১১জন নারী ও ৪ শিশুসহ ১৫ জন রোহিঙ্গা। দালালের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিবির থেকে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন তারা।
এছাড়া জীবিত উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ২ জন বাংলাদেশী নাগরিক। কোস্টগার্ড অভিযান চালিয়ে মানবপাচারকারি দুই দালালকে আটক করেছে। 

জানা যায়, ১১ ফেব্রুয়ারী (মঙ্গলবার) ভোরে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পূর্বজোনের সেন্টমার্টিন বিসিজি ক্যাম্পের একটি দল টেকনাফ সদর ইউনিয়নের তুলাতুলি এলাকা ও বাহারছড়া উপকূল হয়ে ছেড়ে আসা ২টি ট্রলার সেন্টমার্টিনের দক্ষিন-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরের অদূরে দূঘর্টনার কবলে পড়ে ডুবে যাওয়ার সংবাদ পেয়ে উদ্ধার অভিযানে যায় কোস্টগার্ড বাহিনী। এসময় ১টি ট্রলার ডুবে গেলেও অপর ১টি ট্রলার এবং সাগর হতে ভাসমান ১১জন নারী, ৪ জন শিশুর মৃতদেহ এবং ৭২ জন নারী-পুরুষ ও শিশুকে জীবিত উদ্ধার করে। এদের মধ্যে ৪৬ জন নারী ও ২৬ জন পুরুষ। আবার অনেকে সাঁতরিয়ে উপকূলে উঠে গা ঢাঁকা দিয়েছে বলে জানা গেছে। 

টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ট্রলারে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যাচ্ছিলেন মরিয়ম বেগম। মরিয়ম বেগমের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, তার মা, বাবা নেই। মালয়েশিয়াতে পরিচিত অনেকে আছে। ভেবেছিলাম, ওখানে গিয়ে তাদের কাউকে বিয়ে করে ফেলবো। কাজ নয়, বিয়ে করতেই মালয়েশিয়া যাচ্ছিলাম। কিন্তু সেন্টমার্টিনের ছেঁড়াদ্বীপের কাছে পৌঁছালে তাদের ট্রলারটি ডুবে যায়। এতে ১৫ জনের প্রাণহানি হলেও তিনি বেঁচে যান। 

কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মালয়েশীয়াগামী খালেদা বেগম (৩৫) জানিয়েছেন, তার স্বামী মালয়েশিয়া রয়েছেন। সেখানে যেতে তার ছেলে মো.শাহাদ ও মেয়ে নাছিমাকে নিয়ে গত রবিবার রাতে মালয়েশিয়া পাড়ি দিতে সাগর পথে রওয়ানা দেয়। রাত আনুমানিক তিনটার দিকে ট্রলার ডুবে গেলে সে ডুবন্ত টলারের কাঠ ধরে কোনমতে প্রানে বাঁচলেও দুই সন্তানকে চিরতরে হারায়। 

উদ্ধারকৃতরা আরো জানায়, তাদের সাথে প্রায় ১শ ৩৮ জন যাত্রী ছিল। তারা সকলে উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা এবং কয়েকজন বাংলাদেশী। এদের মধ্যে নারী, শিশু ও পুরুষ রয়েছে। কোস্টগার্ডের অপর একটি আভিযানিক দল ডুবে যাওয়া ট্রলারটি উদ্ধার এবং সাগরে জীবিত বা মৃতদেহ উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে। মৃতদেহ আরো বৃদ্ধি পাবে বলে ধারনা করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

সেন্টমার্টিনস্থ নৌ-বাহিনীর লেঃ কমান্ডার এসএম জায়েদুল ইসলাম জানান, সর্বশেষ রাত সাড়ে ৭ টা পর্যন্ত ১৫ জনের মৃতদেহ এবং ৭২ জনকে জীবিত উদ্ধার করে সেন্টমার্টিনে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে টেকনাফ ট্রানজিট জেটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং সাগরে এখনো অভিযান অব্যাহত রয়েছে। 

এদিকে কোস্ট গার্ডের সেন্টমার্টিনস্থ উদ্ধারকারি অফিসার মো. দেলোয়ার জানান, ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ২ জন দালালকে আটক করা হয়েছে। আটককৃত দালালরা জানিয়েছেন, প্রতিজন মালয়েশিয়াগামী থেকে ৩০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। 



এদিকে লাশ গুলো টেকনাফ ট্রানজিট জেটি ঘাটে সন্ধ্যা ৬ টার দিকে পৌঁছলে আইওএমর এম্বুলেন্স এর গাড়ীর মাধ্যমে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এরা সকলকে টেকনাফ বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় এলাকা বাহারছড়ার নোয়াখালী, জুম্মাপাড়া, কচ্চপিয়া, বাঘঘোনা বাজার, টেকনাফ সদরের রাজারছড়া, লম্বরী, তুলাতুলি, হাবিরছড়া, মিঠাপানিরছড়াসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্ট হতে ছোট ফিশিং ট্রলারে করে গভীর সাগরে অপেক্ষামান বড় ট্রলারে মালয়েশিয়া পাচারের জন্য উঠানো হয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য