‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করতে করতে থমকে যায় স্বপ্নিলের কণ্ঠ

বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র স্বপ্নিল আহমেদ পিয়াস (২৪) গতকাল বুধবার গভীর রাতে তাঁর শোবার ঘরে ঘুমাতে যান। হঠাৎ ভোরে ‘আগুন’ ‘আগুন’ চিৎকারে স্বপ্নিলের মা-বাবার ঘুম ভেঙে যায়। তাঁরা স্বপ্নিলকে শোয়ার ঘরের দরজা খুলে ডাইনিং রুমে আসতে বলেন। কিন্তু তিনি দরজা খুলে বের হতে পারেননি। আগুনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় স্বপ্নিল শোবার ঘর লাগোয়া বারান্দায় আশ্রয় নেন। সেখানে তাঁর শরীরে আগুন ধরে যায়। বারান্দায় আটকে পড়ে তিনি সবার কাছে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছিলেন। ১০ থেকে ১৫ মিনিট এভাবে আর্তনাদের পর তাঁর কণ্ঠ থেমে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিস পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া স্বপ্নিলের নিথর দেহ বারান্দা থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। আজ বৃহস্পতিবার ভোরে মর্মান্তিক এই ঘটনা ঘটেছে বাড্ডার আফতাবনগরে।
ফায়ার সার্ভিস বলেছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগে স্বপ্নিল পুড়ে মারা গেছেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, একমাত্র সন্তান স্বপ্নিলকে হারিয়ে তাঁর মা-বাবা পাগলপ্রায়। তাঁরা দুজনই ছেলের স্মৃতি নিয়ে বিলাপ করছেন। স্বপ্নিল একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ বছর বিবিএ পাস করেছেন। তাঁর বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তিনি বর্তমানে বেসরকারি গ্লোবাল টিভি চ্যানেলে কর্মরত।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, স্বপ্নিল তাঁর মা-বাবার সঙ্গে আফতাবনগরের বি ব্লকের ৩ নম্বর সড়কের ৪৪/৪৬ নম্বর বাড়ির ১০ তলায় নিজেদের ফ্ল্যাটে থাকতেন। আজ ভোর সোয়া পাঁচটার দিকে ওই ভবনের ১০ তলায় স্বপ্নিলদের শোয়ার ঘরে আগুন লাগে। স্থানীয় লোকজনের কাছে খবর পেয়ে বারিধারা, খিলগাঁও, তেজগাঁওসহ পাঁচটি ইউনিট পৌনে এক ঘণ্টা পানি ছিটিয়ে আগুন নেভাতে সক্ষম হয়। আগুনে একটি কক্ষসহ ওই ফ্ল্যাটের ৫০ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী রুমা আক্তার প্রথম আলোকে জানান, আগুন লাগার পর স্থানীয় বাসিন্দারা সবাই ছুটে আসেন। এ সময় ১০ তলার বারান্দায় আটকে পড়া স্বপ্নিল ‘বাঁচাও’ ‘বাঁচাও’ বলে আর্তনাদ করছিলেন। একপর্যায়ে তাঁর কণ্ঠ থেমে যায়। কিন্তু তাঁকে বাঁচানো গেল না।
বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী মো. আলম বলেন, ঘটনার পর ভবনটির মেইন বৈদ্যুতিক সুইচ বন্ধ করে দেন তিনি। তাৎক্ষণিকভাবে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়।
স্বপ্নিলের মা শাহিনা হোসেন পাবর্তী ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ভাইয়ের বাসায় দাওয়াত খেয়ে রাত আড়াইটার দিকে স্বপ্নিলকে নিয়ে বাসায় ফেরেন তাঁরা। রাত তিনটার দিকে স্বপ্নিল তাঁর কাছে গাড়ির চাবি দিয়ে বলেন, ‘মা, আমি ঘুমাতে গেলাম।’ এরপর তাঁরাও ঘুমাতে যান। ভোরে হঠাৎ বিকট শব্দে তাঁদের (স্বপ্নিলের মা–বাবা) ঘুম ভেঙে যায়। তখন স্বপ্নিল দরজা খুলে তাঁর কক্ষ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তিনি বেরিয়ে আসতে পারেননি।
শাহিনা বলেন, ‘স্বপ্নিল চিৎকার করে বলছিল, “মা, আগুন লাগছে।” ওর বাবা তখন বলেন, “বারান্দায় গিয়ে দেখতে বলো। হয়তো অন্য কোথাও আগুন লেগেছে।”’ একপর্যায়ে তিনি স্বপ্নিলের কক্ষের বারান্দা বরাবর তাঁদের বারান্দায় গিয়ে দেখেন, গ্রিল ধরে স্বপ্নিল চিৎকার করে বলছেন, ‘মা আগুন লাগছে, আমাকে বের করো।’ তিনি বলেন, ‘স্বপ্নিলের কক্ষের দরজা খোলার চেষ্টা করি। ভবনের ফায়ার অ্যালার্ম বাজিয়ে দিই। প্রতিবেশীদের ডাকতে থাকি। পাশের ফ্ল্যাট থেকে একজন এসে লাথি মেরে দরজা খুলে ফেলে। তখন ওর কক্ষে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছ। আগুনের তীব্রতার কারণে স্বপ্নিল আর বের হতে পারেনি। স্বপ্নিলের বাবা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। আগুন নেভানোর চেষ্টাকালে তিনি পড়ে মাথায় আঘাত পান। আগুন লাগার পর ‘ধাম’ ‘ধাম’ বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। কিন্তু শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র (এসি) সুইচ বন্ধ ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমি ওকে ছাড়া বাঁচব ন।’
স্বপ্নিলের বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন বিলাপ করে বলেন, ‘ওর গেঞ্জিতে আগুন জ্বলছিল। বলার পর গা থেকে গেঞ্জিটি সে খুলেও ফেলেছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। চোখের সামনে ছেলে পুড়ে অঙ্গার হয়ে কুচকে গেল। বাবা হয়ে হাহাকার করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।’
আজ দুপুরে ক্ষতিগ্রস্ত ফ্ল্যাটটিতে ঢুকতেই পোড়া গন্ধ পাওয়া যায়। ক্ষতিগ্রস্ত ফ্ল্যাটটির মেঝেতে পানি জমে আছে। ডাইনিং ও ড্রয়িং রুমে সিলিং পুড়ে গেছে। দেয়ালগুলোয় কালো আস্তরণ পড়ে আছে।
ফায়ার সার্ভিসের বাড্ডা অঞ্চলের উপসহকারী পরিচালক নিয়াজ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ছেলেটি বারান্দায় না গিয়ে ডাইনিং রুমে গেলে হয়তো বেঁচে যেতেন। ভেতর থেকে কক্ষের দরজা বন্ধ থাকায় আগুনের গোলা বারান্দার দিকে গেছে। আগুনে জানালার কাচ গলে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে নিচে পড়েছে। কক্ষটির এসি, টেবিলে থাকা ল্যাপটপ, সাউন্ড সিস্টেম, আসবাবপত্রসহ মালামাল পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। প্লাগ লাগানো ল্যাপটপ, কিংবা এসির সংযোগস্থল বা কক্ষের বৈদ্যুতিক লাইনে শর্টসার্কিট থেকেও আগুন লাগতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
বাড্ডা থানার পুলিশ জানায়, পুলিশের অনুমতি নিয়ে ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বপ্নিলের লাশ স্বজনেরা নিয়ে গেছেন।
আজ বাদ জোহর আফতাবনগরে জানাজা শেষে স্বপ্নিলের লাশ যশোরের অভয়নগর থানার নোয়াপাড়ায় তাঁর পৈতৃক কবরস্থানে দাফন করা হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য