প্রক্সি পরিক্ষার নেপথ্যে ডিপিএইচই’র কর্মচারী আনোয়ার
গাজী গোফরান:
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাজস্ব খাতভুক্ত সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা–২০২৫ ঘিরে কক্সবাজার জেলায় প্রক্সি পরীক্ষার মাধ্যমে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একাধিক প্রার্থী নিয়োগ পেয়েছেন, এমন অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া উপজেলার মো. আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে মেকানিক পদে কর্মরত। অতীতেও তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর ভর্তি পরীক্ষায় প্রক্সি জালিয়াতির অভিযোগে শাস্তি ও কারাভোগের নজির রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার ৪নং সাবরাং ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের মণ্ডলপাড়া গ্রামের আব্দুর রহিম ও সাইরা বানু দম্পতির ছেলে আমান উল্লাহ নাহিন (৩১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় নিজে লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি। তার রোল নম্বর: ৪৬২১০৬৫।
সূত্রের মাধ্যমে খবর আসে, আমান উল্লাহ নাহিন বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে চূড়ান্তভাবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে আসবেন। প্রক্সি পরীক্ষার বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করতে সেদিন সরেজমিনে কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে উপস্থিত হন প্রতিবেদক। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর জানা যায়, তিনি কক্সবাজার জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে স্বাস্থ্যগত উপযুক্ততার সনদ ও ডোপ টেস্টের রিপোর্ট নিতে অবস্থান করছেন। সেখানে গিয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়।
লিখিত পরীক্ষায় নিজে অংশগ্রহণ না করে কীভাবে, কার মাধ্যমে এবং কিসের বিনিময়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন, জানতে চাইলে প্রথমে তিনি উচ্চস্বরে বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে বিভিন্ন কৌশলে আলাপচারিতার একপর্যায়ে অকপটে স্বীকার করেন যে, তার হয়ে অন্য একজন লিখিত পরীক্ষায় প্রক্সি দিয়েছেন।
তিনি জানান, হাটহাজারী উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মচারী এবং তাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বড় ভাই আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে চুক্তিবদ্ধ হয়ে পুরো প্রক্সি পরীক্ষার কাজ সম্পন্ন করেন। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তারা আনোয়ার হোসেনকে ‘প্রক্সি ডন’ ও ‘ডিভাইস ডন’ নামে চিনতেন। এই স্বীকারোক্তি ও কথোপকথনের অডিও রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে।
কথোপকথনের একপর্যায়ে আমান উল্লাহ নাহিন আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তোলেন। তার দাবি, চুক্তি অনুযায়ী লিখিত ও মৌখিক, দুই পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ করানোর কথা থাকলেও ৪ লাখ টাকা দিতে দেরি হওয়ায় মৌখিক পরীক্ষার সময় আনোয়ার তাকে সহযোগিতা করেননি। পরে তিনি নিজ উদ্যোগে ভাইভা বোর্ডের একজনকে ‘ম্যানেজ’ করে মৌখিক পরীক্ষা দেন বলে দাবি করেন।
ভাইভা বোর্ডে কাকে ম্যানেজ করেছেন জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদকের হাত ধরে অনুরোধ করেন বিষয়টি প্রকাশ না করতে। তার ভাষ্য, “এটা বললে আমার পুরো জীবন শেষ হয়ে যাবে।” তিনি আরও দাবি করেন, আনোয়ার তার একাডেমিক সার্টিফিকেটের মূল কপি জিম্মি করে রেখেছিলেন; পরবর্তীতে টাকা দিয়ে তা ফেরত নেন।
একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, লিখিত পরীক্ষায় আমান উল্লাহ নাহিনের হয়ে প্রক্সি দিতে আনোয়ার হোসেন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে ৩ লাখ টাকার চুক্তি করেন। ওই শিক্ষার্থীই পরীক্ষায় অংশ নেন। তার বাড়িও কক্সবাজার জেলায়।
এই প্রসঙ্গে জানতে চেয়ে কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস-এর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শাহীন মিয়ার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “এটা খুবই সংবেদনশীল বিষয়। বিষয়টি আমার জানা নেই। কীভাবে প্রক্সি পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে এবং এই অনিয়মের সঙ্গে কারা কারা জড়িত, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
একই প্রসঙ্গে জানতে চেয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন-এর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আ. মান্নানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে আমাদের জানা নেই। আমি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবো। প্রক্সি পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়ে কেউ সরকারি চাকরি করার সুযোগ নেই। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে প্রমাণিত হলে পুরো সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।”
অভিযুক্ত আমান উল্লাহ নাহিন সম্পর্কে অনুসন্ধানে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠে আসে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় শিক্ষিত ব্যক্তি, সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের এক ইউপি সদস্য এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর এক শিক্ষার্থী জানান, ছাত্রজীবনে তিনি উশৃঙ্খল প্রকৃতির ছিলেন এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-এর সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ইয়াবা সেবন ও পাচার চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
আনোয়ার হোসেন সম্পর্কে অনুসন্ধানে পাঁচজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা হয়। তারা প্রত্যেকেই শিক্ষিত যুবক এবং বিভিন্ন সরকারি চাকরির প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা কিংবা তারও বেশি অঙ্কে প্রক্সির মাধ্যমে উত্তীর্ণ করানোর প্রস্তাব দিতেন আনোয়ার। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক, উভয় পর্যায়ে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো বলেও দাবি তাদের।
তাদের ভাষ্যমতে, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল সুসংগঠিত এবং প্রযুক্তিনির্ভর। পরীক্ষাকেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে প্রশ্নোত্তর আদান-প্রদানের অভিযোগও রয়েছে। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অংশের কাছে তিনি ‘প্রক্সি ডন’ ও ‘ডিভাইস ডন’ নামে পরিচিত ছিলেন।
২০১৮ সালের ২৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর ‘ডি’ ইউনিট ভর্তি পরীক্ষায় প্রক্সি জালিয়াতির ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। ২০১৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব রেসিডেন্স, হেলথ অ্যান্ড ডিসিপ্লিন কমিটি তার মাস্টার্স পরীক্ষার সনদ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। সংশ্লিষ্ট ঘটনায় তিনি কারাবন্দিও ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও সাবেক শিক্ষার্থী জানান, ওই সময় একটি শক্তিশালী প্রক্সি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের কিছু নেতাকর্মীর সংশ্লিষ্টতাও ছিল।
কারামুক্তির পর কিছুদিন আড়ালে থাকলেও পরে পুনরায় সক্রিয় হন আনোয়ার, এমন অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, উচ্চমাধ্যমিকের সনদ ব্যবহার করে তিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে জাতীয় বেতন স্কেল–২০১৫ অনুযায়ী ১৭তম গ্রেডে মেকানিক পদে নিয়োগ পান। বর্তমানে তিনি হাটহাজারীতে কর্মরত হলেও চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার এলাকার কেবি আমান আলী রোডে বসবাস করেন।
স্থানীয়দের দাবি, স্বল্প বেতনের সরকারি কর্মচারী হয়েও তার জীবনযাত্রার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির পাশাপাশি প্রক্সি সিন্ডিকেট আরও সুসংগঠিত করেন তিনি। দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যুক্ত করে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
আনোয়ার হোসেনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি অতীতে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করলেও বর্তমানে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমার নামে নিউজ হলে অফিসে ব্যাখ্যা দিতে হয়, শোকজ হয়, অনেক খরচ হয়।” সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে প্রতিবেদককে চা-নাস্তার জন্য ১০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাবও দেন তিনি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি দেওয়া বা সহায়তা করা গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ হোসাইনী বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৪১৯, ৪২০, ৪৬৫/৪৬৮, ৪৭১ ও ১২০বি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ীও ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
তার মতে, প্রক্সির মাধ্যমে চাকরি প্রাপ্তি প্রমাণিত হলে নিয়োগ বাতিলযোগ্য এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা সম্ভব।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেশের অন্যতম বৃহৎ নিয়োগ প্রক্রিয়া। সেখানে প্রক্সি জালিয়াতির অভিযোগ পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। শিক্ষা ও নিয়োগ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত না করলে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ করা কঠিন হবে।


0 মন্তব্যসমূহ