Recents in Beach

ব্রেকিং নিউজ

চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতালের নথি কারসাজির অভিযোগ! (অনুসন্ধান পর্ব-১)

প্রয়াত ডাঃ রবিউল হোসেনকে ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগ!


নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের চিকিৎসা ইতিহাসে আস্থা, সেবা ও মানবিকতার প্রতীক পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (সিইআইটিসি)। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে অসংখ্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের চোখে আলো ফিরিয়ে দেওয়া এই প্রতিষ্ঠান আজ নিজেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। অভিযোগ উঠেছে, প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়ার লক্ষ্যে প্রয়াত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ রবিউল হোসেন দাপ্তরিক নথিপত্রে গুরুতর কারসাজি ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছিলেন। আর তাঁর মৃত্যুর পর রেখে যাওয়া সেই বিতর্কিত উত্তরাধিকারকে ঘিরে দুই ছেলের মধ্যে তীব্র বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে।


অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে অন্ধ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে একদল স্বপ্নদ্রষ্টা এগিয়ে আসেন। তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জহুর আহমদ চৌধুরী, শিল্পপতি এ. কে. খান, বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ এস. আর. দাশসহ সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্যোগে ১৯৭৩ সালের ২৪ মার্চ গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ অন্ধ কল্যাণ সমিতি, চট্টগ্রাম’-এর একটি অ্যাডহক কমিটি।


ওই কমিটিতে শিল্পপতি এ. কে. খানকে সভাপতি, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডাঃ এস. জোহা, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ এ. কে. এম. আবু জাফর এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক জওশন আরা রহমানকে সহ-সভাপতি করা হয়। যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান ডাঃ কামাল এ. খান ও ডাঃ এস. আর. দাশ। কোষাধ্যক্ষ ছিলেন এলিট পেইন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিরাজ উদ্দিন আহমদ। এছাড়া চক্ষু বিশেষজ্ঞসহ আরও ১৮ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সদস্য করা হয়।


শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব কোনো ভবন ছিল না। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আন্দরকিল্লা ক্যাম্পাসে ছোট্ট একটি কক্ষে অস্থায়ী বহির্বিভাগ চালু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি ৪০ শয্যার হাসপাতালে রূপ নেয়। পরে ইংল্যান্ডের ‘রয়্যাল কমনওয়েলথ সোসাইটি ফর দ্য ব্লাইন্ড’-এর পরিচালক স্যার জন উইলসন হাসপাতালটির উদ্বোধন করেন।


রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় একটি স্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন প্রায় ১০ একর জমি নামমাত্র মূল্যে হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালের ১৯ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে ‘চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ এর স্থায়ী ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।


রাষ্ট্রপতির প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার ফলে জার্মানির আন্দেরী হিলফে এবং ব্রিটিশ সমাজসেবক স্যার জন উইলসনের মতো আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো প্রকল্পটির প্রতি আস্থা প্রকাশ করে। দেশি-বিদেশি সহায়তায় চার বছরের নির্মাণকাজ শেষে ১৯৮৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পাহাড়তলীর ফয়’স লেক সংলগ্ন ক্যাম্পাসে হাসপাতালটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।


অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সময়ের পরিক্রমায় প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক অ্যাডহক কমিটির মূল দলিলটি রহস্যজনকভাবে হারিয়ে গেলেও বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে সংরক্ষিত অনুলিপিতে সেই ইতিহাস এখনও বিদ্যমান রয়েছে। 


এসব নথি অনুযায়ী, শিল্পপতি এ. কে. খান ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং ১৯৮৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সম্পাদিত ট্রাস্ট ডিডেও তাঁকে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ১৯৯১ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে প্রকৌশলী মাহমুদুল ইসলাম এবং পরে একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক এম. এ. মালেক চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তবে অনুসন্ধানের সবচেয়ে আলোচিত অংশটি এসেছে ১৯৭৩ সালের মূল অ্যাডহক কমিটির নথি পর্যালোচনায়। সেখানে দেখা যায়, ‘সেক্রেটারি’ বা সম্পাদকের ঘরটি টাইপ করা একটি ড্যাশ (—) দিয়ে ফাঁকা রাখা হয়েছিল। অথচ একই নথির সাধারণ সদস্য তালিকায় দ্বিতীয় নম্বরে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল— ‘ডাঃ আর. হোসেন, চক্ষু বিশেষজ্ঞ, ৬৪, জামাল খান রোড, চট্টগ্রাম।’


সাংগঠনিক নীতিমালা অনুযায়ী, একই ব্যক্তি একই কমিটিতে একদিকে সাধারণ সদস্য এবং অন্যদিকে সম্পাদক হতে পারেন না। যদি শুরু থেকেই তিনি সম্পাদক হিসেবে মনোনীত হতেন, তাহলে সদস্য তালিকায় তাঁর নাম থাকার প্রশ্নই ওঠে না।


অন্যদিকে, ১৯৮৫ সালের ট্রাস্ট ডিডে ডাঃ রবিউল হোসেন ‘অবৈতনিক সাধারণ সম্পাদক’ হিসেবে স্বাক্ষর করেন। অভিযোগ উঠেছে, পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এ. কে. খানের মৃত্যুর পর তিনি ১৯৭৩ সালের মূল নথিতে সম্পাদকের জন্য ফাঁকা রাখা স্থানে নিজ হাতে নিজের নাম লিখে দেন, যাতে তিনি নিজেকে ১৯৭৩ সাল থেকেই প্রতিষ্ঠানের ‘প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক’ হিসেবে দাবি করতে পারেন।


অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এই পরিবর্তিত নথিকেই পরবর্তীকালে বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।


অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতি (বিএনএসবি), দেশি-বিদেশি দাতা সংস্থা এবং অসংখ্য শুভানুধ্যায়ীর অবদানে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই নথি বিকৃতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মতে, এটি কেবল একটি প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; বরং প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিত্বদের অবদানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার শামিল।


এদিকে, ডাঃ রবিউল হোসেনের মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার ও প্রতিষ্ঠান-নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে দুই ছেলের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। সেই বিরোধের জেরেই অতীতের নানা নথি, সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।


আগামী পর্বে থাকবে: কীভাবে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ধাপে ধাপে বদলে যায়, কোন কোন নথি নিয়ে উঠেছে নতুন প্রশ্ন এবং উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বের নেপথ্যের আরও অজানা তথ্য।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ