মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার খবর জানে না জুয়েলের দুই সন্তান

লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধিঃ

মসজিদের ভেতর কোরআন অবমাননার অভিযোগ এনে মানসিক ভারসাম্যহীন শহিদুন্নবী জুয়েলকে (৫১) নৃশংসভাবে হত্যার পর পুড়িয়ে ফেলার খবর জানে না তার দুই সন্তান। বাবা আর নেই, মানুষরূপী কিছু নরপশু তাদের প্রিয় বাবাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে এ খবর জেনেছে তারা।

তবে শেষ বারের মত বাবার মুখটা দেখার অপেক্ষায় বসে আছে। আর তাই বড় ফুপির কাছে গিয়ে বারবার জানতে চাইছে- বাবাকে দেখতে পারবো তো? কখন নিয়ে আসা হবে বাবাকে? নির্বাক বড় ফুপি সব জেনেও বলতে পারছে না- তোমাদের শেষ ইচ্ছেটুকু পূরণ করার মত কিছু অবশিষ্ট রাখেনি নরপশুরা।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকালে নিহত জুয়েলের বাড়িতে গেলে তার দুই সন্তানকে ঘিরে এভাবেই শ্বাসরুদ্ধকর সময় পার করার কথা বলছিলেন বড়বোন হাসনা আক্তার লিপি। নগরীর শালবন ( সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ সংলগ্ন) মহল্লায় জুয়েল পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। আদিবাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ১৫ নং কাবিলপুর ইউনিয়নের জামালপুর গ্রামের সখিপুর পাড়ায়। বাবা প্রয়াত আব্দূল ওয়াজেদ মিয়া। ১২ বছর বয়সে মাকে হারিয়েছেন জুয়েল।

এরপর বড়বোনের লালন-পালনে বেড়ে ওঠা। রংপুর জিলা স্কুল থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাশের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাইব্রেরি সায়েন্সে স্নাতকোত্তর শেষ করে রংপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে গ্রন্থাগারিক পদে যোগ দেন জুয়েল। একমাত্র মেয়ে দেবা তাসনীয়া অনন্যা কারমাইকেল কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষে এবং ছেলে আবু তাহের মো. আশিকুন্নবী অরণ্য রংপুুুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৭ম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। 

মাঝে মধ্যে মানসিক বিষণ্নতায় ভুগলেও দুশ্চিন্তা ছিল না পরিবারের। বছর খানেক আগে চাকরিচ্যুত হবার পর থেকে মানসিক সমস্যা বাড়তে থাকে-বলছিলেন জুয়েলের বড়বোন লিপি। তিনি বলেন, ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে মুঠোফোন শেষ বারের মত জুয়েলের সাথে কথা হয় তার ‌।

এসময় জুয়েল তাকে বলেছিলেন, চিন্তা করো না বুবু। আমি ভালো আছি। তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো।এরপর থেকেই সারাদিন ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। রাতে তার মৃত্যুর খবর জানতে পারেন লিপি। প্রতিবেশীরা জানান, ছোট বেলা থেকেই শান্ত, ভদ্র ও ধার্মিক ছিলেন জুয়েল। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন। মেধাবী এই মানুষটার এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না বন্ধু, স্বজন, প্রতিবশীসহ শুভাকাঙ্ক্ষীরা কেউই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বৃহস্পতিবার লালমনিরহাটের বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আসরের নামাজ শেষে পাঠ করার জন্য মসজিদের সানসেটে রাখা কোরআন শরীফ নামাতে গিয়ে অসাবধনাতাবশত কয়েকটি কোরআন ও হাদিসের বই তার পায়ে পড়ে যায়।

এ সময় তুলে চুম্বনও করেন জুয়েল। বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে মুয়াজ্জিনের কথা কাটাকাটি হয়। এরপর আশপাশের লোকজন ছুটে এসে সন্দেহবশত জুয়েল ও তার সহযোগীকে পাশে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের একটি কক্ষে আটকে রাখেন।

পুরো বাজারে এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, কোরআন অবমাননার দায়ে দুইজনকে আটক করা হয়েছে। এ সময় উত্তেজিত হয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের দরজা জানালা ভেঙে জুয়েলকে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে মরদেহ টেনে পাটগ্রাম-বুড়িমারী মহাসড়কে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য