তারকা হোটেলের সেবা সুনির্দিষ্ট করল সরকার, এই নিয়ম মানছে না কক্সবাজারে

আব্দুল আলীম নোবেলঃ
আসলে আমরা পর্যটনের কারণে কক্সবাজারকে নিয়ে অনেক গর্ব করে থাকি। স্বীকার করি আর না করি পর্যটন আমাদের সম্পদ ও সম্মান। আজকের পদক্ষেপ আগামীর অর্থনীতির কর্ণধারে পরিনত হবে, সৃষ্টি হবে কয়েক লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান।  মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় বদলে যাবে কক্সবাজারের চেহরা। তেমনটা হলেও আমাদের বিশাল গলদ রয়েছে। মানছি না কোন নিয়ম কানুন। সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে এগুচ্ছে এই পর্যটনের নির্মান যাত্রা। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বয় ও পর্যটন স্টকহোল্ডাদের চরম গাফেলিত বলতে পারি। দেখা যায়, বিশ্ব পর্যটন দিবস আসলে নানা ধরণের গালগল্প করে দিন শেষ করলেও দিন শেষে ঠিকই লাভের খাতা শূণ্য কোটায়। এমন চরিত্র থেকে বের হয়ে না আসলে কোনভাবে আগামী প্রজন্ম আমাদের কোন দিন ক্ষমা করবে না। সব কিছু নিয়মের সংস্কৃতির মধ্যে না থাকে একদিন এমন সময় আসবে  লাগলাম টেনে ধরে রাখা অনেক  কঠিন হয়ে পড়বে। 

সরকার নির্ধারিত সেবা নিশ্চিত করলেই শুধু তারকা হোটেল ও রিসোর্টের স্বীকৃতি মিলবে। এখন থেকে অবকাঠামো, বিভিন্ন সেবা ও জনবলের দক্ষতা দিয়ে হোটেল বা রিসোর্টের মান বিবেচনা করা হবে। এ জন্য এক তারকা থেকে পাঁচ তারকা পর্যন্ত হোটেল ও রিসোর্টের সেবার ধরন নির্ধারণ করে দিয়ে বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ বিধিমালা সংশোধন করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। 

সংশোধিত বিধিমালায় তারকা মানের হোটেলগুলোতে কী কী সেবা থাকতে হবে ও সেগুলোর জন্য কী পরিমাণ জনবল থাকতে হবে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সম্প্র্রতি প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা বিধিমালায় তারকা মানের হোটেলগুলোতে নিয়োগ দেওয়া কর্মচারীদের সরকার স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হওয়ার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কোন মানের হোটেলে কতটি কক্ষ থাকতে হবে এবং কক্ষের আয়তন কত হবে তাও সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে নতুন বিধিমালায়। দেশের পর্যটন খাতের উন্নয়ন, হোটেল ও রিসোর্টের মানোন্নয়ন, গ্রাহকসেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ নীতিমালা সংশোধন করা হয়েছে। 

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মিজানুর রহমানের বক্তব্য সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিক চেইনের হোটেলগুলোর মান হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসার আন্তর্জাতিক সংগঠন ঠিক করে থাকে। এর বাইরে স্থানীয় যেসব হোটেল ও রিসোর্ট দেশে চালু রয়েছে সেগুলোর মান সরকার এ নীতিমালার মাধ্যমে ঠিক করে। আন্তর্জাতিক মানকে ভিত্তি ধরে এবং দেশের সংশ্নিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীদের মতামত নিয়ে এ নীতিমালা করা হয়েছে। এ বিধিমালা অনুসরণ করে জেলা প্রশাসকরা তদন্ত সাপেক্ষে হোটেল ও রিসোর্টের তারকা মানের সনদ দিয়ে থাকেন। কোনো প্রতিষ্ঠানের একটি বা দুটি সূচকে ঘাটতি থাকলে সময় নিয়ে সেগুলো ঠিক করতে পারবে। 

৩০ মে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এক তারকা মানের হোটেলের মোট কর্মচারীর ১০ শতাংশ, দুই তারকা হোটেলের কর্মচারীর ২০ শতাংশ, তিন তারকা হোটেলের ৩০ শতাংশ, চার তারকা হোটেলের ৪০ শতাংশ ও পাঁচ তারকা হোটেলের কর্মচারীর ৫০ ভাগ সরকার স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হবে। এক তারকা হোটেলে কমপক্ষে ১০টি কক্ষ থাকতে হবে। দুই তারকার ক্ষেত্রে তা ৩০টি, তিন তারকার ক্ষেত্রে ৫০টি, চার তারকার ক্ষেত্রে ৭৫টি ও পাঁচ তারকা হোটেলের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১০০টি কক্ষ থাকতে হবে।

দুই তারকা হোটেলের মোট কক্ষের কমপক্ষে ২০ ভাগ, তিন তারকা থেকে পাঁচ তারকা পর্যন্ত হোটেলগুলোর সব কক্ষে ও কমন স্পেসে এয়ারকন্ডিশনিং ও হিটিং ব্যবস্থা থাকতে হবে। তিন, চার ও পাঁচ তারকা হোটেলে হেয়ার ড্রায়ার, ওভেন ও সমজাতীয় অন্যান্য ব্যবস্থা, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডে বিল দেওয়ার ব্যবস্থা, বুফে ব্যবস্থায় সকালের নাশতা, দুপুর ও রাতের খাবার ও মিনি রেফ্রিজারেটর (ছোট ফ্রিজ), প্রতিটি কক্ষে সার্বক্ষণিক ঠাণ্ডা ও গরম পানির ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। এক তারকা থেকে পাঁচ তারকা পর্যন্ত হোটেলে সেবার তালিকা ও সেবা মূল্য প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এক তারকা হোটেলের নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা থাকতে হবে। দুই তারকা হোটেলে কমপক্ষে ১০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তিন তারকার ক্ষেত্রে ৫০টি, চার তারকার ৭৫টি ও পাঁচ তারকার ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১০০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। দুই তারকা মানের হোটেলে ইন্টারনেট সংযোগ থাকতে হবে। তিন, চার ও পাঁচ তারকা হোটেলে কনফারেন্স কক্ষসহ প্রতিটি কক্ষে ও উন্মুক্ত স্থানে ওয়াইফাইসহ তারযুক্ত ইন্টারনেট সংযোগ, ফ্যাক্স, ফটোকপিয়ার, প্রিন্টার, স্ক্যানারসহ বিজনেস সেন্টার থাকতে হবে। এসব হোটেলের নিজস্ব ওয়েবসাইট, অনলাইন রিজার্ভেশন ব্যবস্থা থাকতে হবে। 

বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, এক তারকা হোটেলের কমপক্ষে ৫০ ভাগ কক্ষে সংযুক্ত স্নানাগার থাকতে হবে। দুই ও তিন তারকার ক্ষেত্রে শতভাগ কক্ষে স্নানাগার থাকতে হবে। চার ও পাঁচ তারকা হোটেলের শতভাগ কক্ষের পাশাপাশি অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্থানে সংযুক্ত স্নানাগার থাকতে হবে। এক ও দুই তারকা হোটেলে ব্যাঙ্কুয়েট হল বা মাল্টিপারপাস হল না থাকলেও চলবে। তবে তিন থেকে পাঁচ তারকা হোটেলের ক্ষেত্রে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন আসনের এক বা একাধিক হল থাকতে হবে। তিন থেকে পাঁচ তারকা মানের হোটেলে আধুনিক জিমনেশিয়াম, সুনা, স্টিম বাথ ও স্পা এবং পৃথক লাগেজ রুম, স্টোর ও সেফটি ভল্ট বা লকার, লন্ডিু এবং বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা থাকতে হবে। চার ও পাঁচ তারকা হোটেলে সুইমিং পুল ও গাড়ি ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। 

রিসোর্ট :এক তারকা রিসোর্টে কমপক্ষে ১০টি, দুই তারকার ক্ষেত্রে ১৫টি, তিন তারকার ক্ষেত্রে ৩০টি, চার তারকার ক্ষেত্রে ৪০টি ও পাঁচ তারকা রিসোর্টে কমপক্ষে ৫০টি কক্ষ থাকতে হবে। তিন তারকা থেকে পাঁচ তারকা পর্যন্ত রিসোর্টগুলোর সব কক্ষে ও কমন স্পেসে এয়ারকন্ডিশনিং ও হিটিং ব্যবস্থা থাকতে হবে। তিন, চার ও পাঁচ তারকা ত ১০টি, তিন তারকার ক্ষেত্রে ২০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য