পঞ্চগড়ে নিউরো রোগির সংখ্যা বাড়ছে বুলবুলিদের মতো অনেকে সরকারীস্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছেনা

মো. কামরুল ইসলাম কামু, পঞ্চগড় প্রতিনিধিঃ 

পঞ্চগড়ে নিউরো রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বাত, ব্যথা, পক্ষাঘাত গ্রস্থ পুন:বাসনসহ  পেইন মেনেজমেন্ট সংক্রান্ত নিউরো জটিলতা রোগের কমপক্ষে ২০ হাজার রোগী রয়েছে এ জেলায়। এ সকল রোগীর অধিকাংশরই প্রয়োজন ফিজিওথেরাপি। সরকার  রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন ২০১৮ পাস করলেও মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের মাত্রা অত্যন্ত ধীর। 

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দারিদ্র কল্যাণ সংস্থা প্রতিবন্ধী ফিজিওথেরাপি সেবা দিচ্ছেন এছাড়াও জেলায় সরকারি দুটি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র রয়েছে। সেইগুলোতেও জনবল সংকট  ও যন্ত্রপাতির অধিকাংশ সময় বিকল থাকায় সাধারণ মানুষ প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জেলায় কোন আবাসিক ফিজিও থেরাপি হাসপাতাল সরকারি বা বে-সরকারি পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা হয়নি। 

কারও কারও সামর্থ থাকলেও উপজেলা শহর বা গ্রামে ফিজিও টেকনিশিয়ান না থাকায় সাধারণ মানুষ এ সেবাটি নিতে পারছে না। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফিজিও থেরাপি টেকনিশিয়ান ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবী। যাদের টাকা রয়েছে তারও সেবা নিতে পারছেন না। যাদের নেই তারাও প্রাপ্ত সেবা নিতে পারছেন না। প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডেই ৫/৭ জন প্যারালাইসসি রোগীর সন্ধ্যান মিলছে। 

এর  সাথে অন্যান্য ফিজিও সম্পৃক্ততা রোগীর সংখ্যাও কম নয়।  জরুরীভাবে বিষয়টি সরকারের ভাবা উচিৎ। অন্যথায় সচল একটি বিরাট অংশ চিকিৎসা সেবার অভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে যাচ্ছে।বুলবুলি(৭৫) পঞ্চগড় সদর উপজেলার  ৩নং ইউনিয়নের মোলানীপাড়া গ্রামে বাসন্দিা। যৌবনে স্বামী সন্তান পরিবার পরিজনের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। 

পরিবারের কাজ করতে গিয়ে পাননি কোন মজুরী বা অভারটাইম। খেতে খামারেও কাজ করেছেন। তার প্রতিটি কাজই একজন নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যেই পড়েছে। প্রতিদিন বাড়ী বাড়ী ঘুরে অসংখ্য নারীকে আল-কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। এ কাজটি করেছেন তিনি কয়েক যুগ ধরে। পারিশ্রমিকের বিষয়ে কোন আবেদন, নিবেদন তাঁর ছিল না কখনই। দরিদ্র পরিবারের সদস্য বুলবুলি স্বামী কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। ছেলেও হয়েছেন কাঠমিস্ত্রি। 

পরিবারে আয়-রোজগার খুব একটা নেই। গত কয়েক বছর আগে বুলবুলি ব্রেইনস্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এক হাত, এক পা অবস্ হয়ে যায় বাঁক শক্তিও বন্ধ হয়ে যায়। বিছানায় প্রয়োজনীয় সকল কাজ তাকে করতে হয়। এজন্য তার পেছনে প্রয়োজন সবসময় পরিচর্যাকারী, অর্থেরও প্রয়োজন। ছেলে রেজাউল মা’কে সুস্থ্য করবার জন্য ঘুরেছেন বিভিন্ন ডাক্তারের কাছে। 

বুলবুলি বয়সের ভারে নজু, রোগে শোকে ক্লান্ত। যে রাষ্ট্রকে জীবনের মূল্যবান সময়টুকু দিলেন, পরিবারকে দিলেন  সেই রাষ্ট্র বা পরিবারের কাছে কতটুকুই বা পেলেন। প্রতি মুহুর্তে মৃত্যুর জন্য ক্ষণ গণনা করছেন। এই নিদারুন কষ্টের চেয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়াই উত্তম। এমনটিই তাঁর ইশারা ইঙ্গিতের ভাষায় বোঝা যায়।

বোদা উপজেলার বেংহাড়ী ইউনিয়নের ঝেরঝেরিয়াপাড়া গ্রামের দরিদ্র পরিবারের যগেন্দ্রনাথ(৭০) তিনিও একই রোগে আক্রান্ত হয়ে কঠিন সময় পার করছেন। বিছানা থেকে উঠতেই পারছেন না, বাক-শক্তিও হারিয়েছেন। একমাত্র সংসারে একমাত্র আয়ের ব্যক্তিটি তার ছেলে। সেও অসুস্থ্য। এর পরেও  পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন ওঝা  কবিরাজের কাছে নিয়ে গেছেন। 

এই গ্রামে আরও বেশ কয়েকজন আক্রান্ত হয়েছেন। সদর উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের রজলী খালপাড়া গ্রামের আব্বাস আলী (৬৫) তিনিও একইভাবে আক্রান্ত হয়ে দিন যাপন করছেন। একমাত্র ছেলে আয়-রোজগারের জন্য ঢাকায় গার্মেন্টস্ কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। স্ত্রী বহু আগেই পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। 

কলেজ পড়–য়া ছোট্ট মেয়েটির ঘারে পড়েছে সংসারের দায়-দায়িত্ব। কোনমতে সংসার চালাচ্ছেন আর বাবার সেবা করছেন। বিছানায় প্রয়োজনীয় কাজ সারেন আব্বাস আলী। ছোট্ট মেয়েটির চোখে ও মুখে যেমন অন্ধকারের ছাপ তেমনি পিতার চোখে মুখে বেঁচে না থাকার আকুল আবেদন।দেশ স্বাধীনের পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের পারিপার্শ্বিক অবস্থায় নন -কমিউনিক্যাবল রোগের চিকিৎসা ও পুন:বাসনসহ ব্যথা নিরাময় ও প্রতিরোধে ফিজিও থেরাপি এবং রিহ্যাবিলিটেশন চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। 

দেশের সাধারণ মানুষের জন্য বাথ, ব্যাথা নিরাময় ও পক্ষাঘাত গ্রস্থদের পুন:বাসনসহ  পেইন মেনেজমেন্ট রোগীদের চিকিৎসার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৭৫’র পর  বঙ্গবন্ধুর  সে উদ্যোগ আর আলোর মুখ দেখেনি। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর পিতার উদ্যোগকে সফল করবার জন্য আবারও কাজ শুরু করেন। 

১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রিহ্যাবিলিটেশন চিকিৎসা সেবা সহজলোভ্য করেন। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিশ্ব দরবারে সুনাম অর্জন করেন প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। জাতিসংঘের অটিজম বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। 

২০১৮ সালে সরকার রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন পাশ করেন এবং সে মতেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল গঠন করেন। সচেতন মহল মনে করেন ফিজিও থেরাপি চিকিৎসা সেবা কিভাবে সাধারণের দোড়গোড়ায় পৌছে দেয়া যায় সে ব্যাপারে  সরকারকে  এখনই উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। দেশে একজন ফিজিওথেরাস্টি এর কাধে দশ হাজারে অধিক মানুষের দায়িত্ব পড়েছে, ফলে  সরকারি বে-সরকারি রিহ্যাবিলিটেশন ইন্সটিটিউট দ্রুত প্রতিষ্ঠা জরুরী হয়ে পড়েছে। 

সিভিল র্সাজন ডা. মোঃ  ফজলুর রহমানের মনে করেন এসকল রুগীর জন্য বিষেশায়িত ইউনিট ও জনবল প্রয়োজন। তিনি আশাবাদী সরকার নিশ্চই সরকার ব্যবস্থা নিবেন ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য