পঞ্চগড়ে জয়নুল জালিয়াতিতে সেরা

মোঃ কামরুল ইসলাম কামু,পঞ্চগড়ঃ 
এ জন্য মগের মুল্লুক সব ধরনের অনিয়ম দুর্নীতিকে জায়েজ করে ফেলেছে দাপট আর সুযোগ পেয়ে। পঞ্চগড়ের জয়নুলের জালিয়াতি আধুনিক সময়ের সব প্রতারককে ছাড়িয়ে গেছে। জেলায় প্রতিষ্ঠিত ও এমপিওভুক্ত তিনটি মাদরাসার নাম নকলসহ কাগজপত্র জাল করে নিজের পরিধিতে গড়ে উঠেছে একই নামে আরও তিনটি মাদরাসা। 

ওই তিনটি মাদরাসায় শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এই জয়নুল। শুধু এই তিন মাদরাসাই নয় পঞ্চগড়ের বিভিন্ন স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসা কাগজপত্র তৈরি করে তা জাতীয়করণের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার নাম করে হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ টাকা। জয়নুলের প্রতারণা শুরু এখানেই নয় পত্রিকায় ব্যাক ডেটে ভুয়া নিয়োগ ছাপাসহ বিভিন্ন জমির দলিল ও বিভিন্ন দপ্তরের বড় বড় কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ বেশ পুরনো। 

নাম তার জয়নুল ইসলাম। পিতার নাম নছিম উদ্দিন। বাড়ি পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার কাজলদিঘী কালিয়াগঞ্জ ইউনিয়নের মন্নাপাড়া এলাকায়। বোদা উপজেলার বড়শশী ইউনিয়নের আরাজি মাড়েয়া খালপাড়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসার সহকারী শিক্ষক তিনি। এক সময় শিবিরের সক্রিয় সদস্য হলেও নিজেকে এখন তিনি পঞ্চগড় জেলা স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষক সমিতির সভাপতি দাবি করেন। 

তবে তার এই জালিয়াতি কর্মের শেল্টার হিসেবে ব্যবহার করেন সাংবাদিক পরিচয়। নিজেকে কমপক্ষে ৮ টি বাংলা ও ইংরেজি দৈনিকের সাংবাদিক দাবি করেন তিনি। কোন সাংবাদিক না থাকলেও সে নিজে নিজেই একটি সাংবাদিক সংগঠনের সভাপতি বনে গেছেন। কোন খবর সংগ্রহ করতে  দেখা না গেলেও দিব্যি জালিয়াতি কর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। 

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার পামুলী ইউনিয়নের নগরডাঙ্গা এলাকায় ১৯৮৫ সালে পামুলী নগরডাঙ্গা স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৪ এমপিওভুক্ত এই মাদরাসাটির নাম হুবহু নকল করে এবং কাগজপত্র জাল করে বোদা উপজেলার কাজলদিঘী কালিয়াগঞ্জ ইউনিয়নের মন্নাপাড়া এলাকায় একটি স্বতন্ত্র মাদরাসা গড়ে তোলে জয়নুল ইসলাম। 

মাদরাসাটি জাতীয়করণের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার জন্য সব ধরণের জাল জাতিয়াতির কৌশল নেয় জয়নুুল। এমনকি ওই এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নামে আসা সরকারি প্রণোদনার টাকাও তুলে নেন জয়নুল। বোদা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস থেকে পাওয়া ওই মাদরাসার কাগজপত্রে দেখা যায় মাদরাসাটি ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৬৬ সালের মাদরাসার জমি রেজিস্ট্রির দলিল জমা দেয়া হয়েছে। 

পাকিস্তান আমলে দেখানো ওই দলিলের উপরে লেখা রয়েছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। এখানে দলিল জালের বিষয়টি ধরা পড়ে যায়। এছাড়া ওই ভুয়া মাদরাসার অনুকুলে যে সকল কাগজপত্র জমা দিয়েছেন তার সবগুলোই জাল। এমনকি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের উপপরিদর্শক  মো. হোসেনের স্বাক্ষরসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। 

ভুয়া ওই মাদরাসার মঞ্জুরির কাগজটিও জাল। যে কাগজের লেখাটি কম্পিউটার টাইপ করা। অথচ সেই সময়ে অফিসে কম্পিউটারের ব্যবহার ছিলো না। লেখা হতো টাইপ রাইটারে। এছাড়া ১৯৯০ সালের মঞ্জুরি দেখালেও ব্যাংক একাউন্ট দেখানো হয়েছে ২০১৯ সালে। 

ব্যানবেইজে শিক্ষার্থীসহ সব ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে। এমনকি ওই মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটির সাধারণ সম্পাদক জয়নুল নিজেই। আবার ওই মাদরাসার সহকারী ক্বারী শিক্ষক পদে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করে জয়নুল। 

শুধু এই মাদরাসাই নয় পঞ্চগড় সদর উপজেলায় আরও দুটি এমপিওভুক্ত মাদরাসার নাম ও কাগজপত্র জালিয়াতি করে একই কায়দায় সদর উপজেলার কামাতকাজলদিঘী ইউনিয়নের খারুয়াগ্রাম ও বন্দরপাড়া দুটি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী গড়ে তোলে জয়নুল। স্থানীয়দের অভিযোগ জয়নুল এই তিন মাদরাসায় শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। 

৩ লাখ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন প্রতিটি শিক্ষকের কাছে। জাল ও ভুয়া কাগজপত্র নিয়ে মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন স্থানে দৌড়ঝাপ করছেন তিনি। এছাড়া পঞ্চগড়ের পত্রিকায় ব্যাক ডেটে ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাপাসহ বিভিন্ন জমির দলিল ও বিভিন্ন দপ্তরের বড় বড় কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জালের ব্যবসা রয়েছে তার। 

ওই মাদরাসাগুলোতেই দৈনিক আজকের প্রভাত পত্রিকায় ব্যাক ডেটে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাপায় জয়নুল। এমনকি ওই মাদরাসাগুলোর ছবি নিতে গেলে জয়নুলের লোকজনের বাঁধার স্বীকার হয় গণমাধ্যমকর্মীরা। জাল জালিয়াতির টাকায় জয়নুল গড়েছেন আলিশান বাড়ি। 

পামুলী নগরডাঙ্গা স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসার প্রধান শিক্ষক আব্দুল ওয়ারেস বলেন, জয়নুল এভাবেই কাগজপত্র জাল ও কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে আমাদের মাদরাসার নাম হুবহু নকল করে তার বাড়ির কাছে একটি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছে। 

কায়দা করে আমাদের প্রণোদনার টাকাও জয়নুল তুলে নিয়েছে। ৩৫ বছর ধরে শিক্ষা দান করে আসলেও আমাদের শিক্ষকরা প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এ বিষয়ে বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেছি। আমরা চাই এই জালিয়াতির সাথে যারা যুক্ত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হোক। 

কাজলদিঘী কালিয়াগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলাউদ্দীন আলাল বলেন, ২০১৯ সালে জয়নুল ওই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে। এর আগে সেখানে কোন মাদরাসা ছিলো না। তবে সে কাগজপত্র ও অন্য মাদরাসার নাম জালিয়াতি করেছে কিনা তা আমার জানা নেই। তবে ওই নামে আমাদের এলাকায় কোন স্থান নেই। 

বোদা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল হোসেন বলেন, ওই মাদরাসার কাগজ নিয়ে জয়নুলই বেশি দৌড়ঝাপ করছেন।  শুনেছি শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে অনেক টাকাও নিয়েছেন। ওই মাদরাসার অনুকুলে যে সকল কাগজপত্র দিয়েছে তারা তার মধ্যে অনেক গড়মিল পেয়েছি আমরা। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।  

পঞ্চগড় সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম প্রামানিক বলেন, শুরুতে পঞ্চগড় সদর উপজেলার কামাতকাজলদিঘী ইউনিয়নে গড়ে তোলা ডুবানুচি বরকতিয়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসা ও শুরিভিটা হাসনায়নীয়া নজিরিয়া দাখিল মাদরাসা নামে দুটি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসার কাগজপত্র নিয়ে আসে জয়নুল নিজেই। 

নিজেকে সাংবাদিক বলেও পরিচয় দেন। অভিযোগ উঠার পর আমি নিজে সরেজমিনে মাদরাসাগুলো পরিদর্শন করি এবং কাগজপত্র যাচাই করি। সে ১৯৬৬ সালের যে দলিল দিয়েছে সেই নাম্বারে কোন বালাম খুঁজে পাইনি। সম্ভবত দলিলটি জাল। এছাড়া তার প্রতিটি কাগজেই স্বাক্ষরগুলো নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। 

বিষয়টি মাদরাসা বোর্ড তদন্ত করে দেখলেই সত্যটা বেড়িয়ে আসবে। এছাড়া আমরা ওই দুটি প্রসিদ্ধ মাদরাসার নাম নকল করে গড়ে তুলেছে বলে প্রমাণ পেয়েছি। 

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহীন আকতার বলেন, জয়নুল নামে এক সাংবাদিক দীর্ঘদিন ধরেই ওই মাদরাসাগুলো নিয়ে দৌড়ঝাপ করছেন। ওই মাদরাসাগুলোর প্রণোদনার টাকা দেয়ার জন্য বার বার অফিসে এসেছেন। কিন্তু মন্ত্রণালয়ে তালিকা ছাড়া কাউকে প্রণোদনা দিতে পারবো না বলে জানিয়ে দেই।  

বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোলেমান আলী বলেন, নাম ও কাগজপত্র জালিয়াতি করে নতুন করে মাদরাসা গড়ে তোলার একটি অভিযোগ পেয়েছি। এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদ আল হাসানকে প্রধান তিন সদস্য বিশিষ্ট্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। 

পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আজাদ জাহান বলেন, ওই তিন মাদরাসার বিষয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে। আমরা অভিযোগের কিছু প্রমাণও পেয়েছি। এই জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 

এ বিষয়ে জয়নুল ইসলাম বলেন, শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে অর্ধকোটি টাকা আদায়ের বিষয়টি ঠিক নয়। যেখানে যা টাকা লাগে শিক্ষকরা বহন করে। তিনটি মাদরাসা আমি করেছি। শুধু তিনটিই নয় জেলার অনেক মাদরাসার শিক্ষকরা বোকাশোকা তাই তারা আমাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়। 

দলিল, কাগজপত্র ও স্¦াক্ষর জালের বিষয়ে জয়নুল বলেন, আমি দলিল, কাগজপত্র ও স্বাক্ষর যাই জাল করি না কেন তাতো কোন দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ প্রমানিত হয় নি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য