প্রত্যাহারের পরও এক মৎস্যজীবীকে ক্রস ফায়ারের ভয় দেখালেন আরডিসি নাজিম (ভিডিও)

নিউজ ডেস্কঃ
‘মামলা তুলবি না, তোর কোন বাপ বাঁচায় এখন দেখি? পাঁচদিন পর পর তোকে রিমান্ডে নেবো।' এই কথা বলে দুই মৎস্যজীবীকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রাম থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ পাওয়া আরডিসি নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে। শুধু তা-ই নয়, প্রত্যাহারের নির্দেশ পাওয়ার পরও জামিনে মুক্ত ওই দুই মৎস্যজীবীর একজনকে ধরে নিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নাজিমের বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) দুপুরে জেলগেট থেকে এক মৎস্যজীবীকে ধরে ডিসি অফিসে নিয়ে নাজিম বলেছেন, 'তোকে তো র‍্যাব খুঁজতেসে, তোর বাঁচার কোনও পথ নাই, তোকে ক্রসফায়ারে দিয়ে দেবে।’ ভুক্তভোগী মৎস্যজীবী বিশ্বনাথ নম দাস বাংলা ট্রিবিউনকে এসব কথা বলেন। 

গিরাই নদী বিল লিজ নিয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন করায় ক্ষুব্ধ কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীনের নির্দেশে নাগেশ্বরী থেকে মৎস্যজীবী বিশ্বনাথ নম দাস (৩৫) ও খালেকুজ্জামান মজনুকে মধ্যরাতে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীদের একজনকে এক বছর ১১ মাস এক দিন এবং অপরজনকে ছয় মাসের সাজা দেন আরডিসি নাজিম উদ্দিন। এই দুই জনকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় আরডিসি নাজিম উদ্দিন বেদম মারপিট করেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। 

বিশ্বনাথ নম দাস জানান, 'জামিনে মুক্তি পেয়ে আজ মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) দুপুরে কুড়িগ্রাম কারাগার থেকে বের হই। বের হওয়ার পরপরই আমাকে জেলা প্রশাসনের গেস্টরুমে ধরে নিয়ে যান নাজিম উদ্দিন। সেখানে গণমাধ্যমে কোনও কিছু বলা যাবে না মর্মে ভিডিও ধারণ করা হয়। এ সময় আমাকে বলা হয়, তোকে র‍্যাব খুঁজছে। ক্রসফায়ারে না পড়তে চাইলে আপাতত কুড়িগ্রামের বাইরে গিয়ে থাক।’ এরপর তাকে কুড়িগ্রামের খলিলগঞ্জ এলাকায় নিয়ে গিয়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে গিয়ে বিশ্বনাথ নম দাস কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। বর্তমানে তিনি কুড়িগ্রাম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

 তিনি আরও বলেন, ‘তুলে আনার দিন আরডিসি নাজিম বললেন, তোর কোন বাপ বাঁচায় আমি দেখবো। পাঁচ দিন পর পর রিমান্ডে নেবো। এরপরই আমাকে মারতে মারতে মধ্যরাতে তুলে নিয়ে আসে। রাতেই আমাকে এক বছর ১১ মাস ১ দিন সাজা দেন তারা। আর একজনকে ছয় মাস সাজা দেন। আমাদের কোনও অপরাধ ছিল না। আমি বিচার চাই।’
কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) মধ্যরাতে আরডিসি নাজিম উদ্দিন সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে গিয়ে দুই মৎস্যজীবীকে তুলে ডিসির কার্যালয়ে নিয়ে আসেন। রাতেই তাদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা প্রদানের অভিযোগে পেনাল কোডের ১৮৮ ও ১৮৯ ধারায় বিশ্বনাথ নম দাসকে এক বছর ১১ মাস এক দিন এবং খালেকুজ্জামান মজনুকে ছয় মাসের বিনাশ্রম সাজা দেওয়া হয়। পরদিন ২৭ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন নিজেই খালেকুজ্জামান মজনুকে জামিন দেন। এরপর বিশ্বনাথ নম দাস গত ১ মার্চ আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদন করেন। মোবাইল কোর্টের আদেশের নথিপত্রের জন্য আবেদন করলে শুনানি কিংবা জামিনের জন্য কোনও দিন তারিখ ঠিক করা হয়নি। হঠাৎই ১৬ মার্চ সন্ধ্যায় গোপনে বিশ্বনাথ নম দাসকে জামিন দেন এডিএম সুজা উদ দৌলা। 

জানতে চাইলে নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘মৎস্যজীবী বিশ্বনাথ নম দাস ও খালেকুজ্জামান মজনুকে আমি মারধর করিনি। জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন স্যারের নির্দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। সরকারি কাজে বাধা প্রদানের অপরাধে বিধিমোতাবেক দুই ব্যক্তিকে পেনাল কোডের ১৮৮ ও ১৮৯ ধারায় সাজা দেওয়া হয়। যা কিছু হয়েছে, সবকিছুই জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন স্যার জানেন।’ 

উল্লেখ্য, বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের বাড়িতে মধ্যরাতে হানা এবং তাকে তুলে নিয়ে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে সাজা দেওয়ার ঘটনায় আরডিসি (সিনিয়র সহকারী কমিশনার রাজস্ব) নাজিম উদ্দিন, সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এসএম রাহাতুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। রবিবার (১৫ মার্চ) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো প্রজ্ঞাপনে এ কথা জানানো হয়। ডিসি সুলতানা পারভীনকেও এর আগেই প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘হাইকোর্টে রিট করায় ক্ষুব্ধ ডিসি সুলতানা পারভীনের নির্দেশে দুই মৎস্যজীবীকে মধ্যরাতে তুলে এনে অন্যায়ভাবে মোবাইল কোর্টে সাজা দেওয়া হয়েছিল আরডিসি নাজিম উদ্দিনকে দিয়ে। আরডিসি ছিলেন জেলা প্রশাসকের প্রধান সেনাপতি। অনেক কিছুই তারা করেছে। আস্তে আস্তে আপনার এসব জানতে পারবেন।’ 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাগেশ্বরী থানার ওসি রওশন কবির বলেন, ‘আমি ২৬ ফেব্রুয়ারি স্টেশনেই ছিলাম। কিন্তু ওই দিন কোনও মোবাইল কোর্ট দিনে কিংবা রাতে করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এমনকি আমার থানার কোনও পুলিশ সদস্যও মোবাইল কোর্টে পাঠানো হয়নি।’ 

জানতে চাইলে নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুর আহমেদ মাসুম বলেন, ‘আমি আপনার মুখেই প্রথম জানতে পারলাম ২৬ ফেব্রুয়ারি নাগেশ্বরীতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছেন আরডিসি নাজিম উদ্দিন। কিন্তু আমার অফিসে এ সংক্রান্ত কোনও তথ্য নেই। আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘গিড়াই নদী বিল নামে একটি বিল নিয়ে মৎস্যজীবীদের মধ্য থেকে বিশ্বনাথ নম দাস নামে এক ব্যক্তি লিজ প্রদানকে কেন্দ্র করে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন করেছেন। কিন্তু এই রিট পিটিশন ছাড়া আর তেমন কোনও বিষয়ে আমার জানা নেই। কেন এবং কী অপরাধে ওই দুই ব্যক্তিকে মধ্যরাতে তুলে নিয়ে গিয়ে মোবাইল কোর্টে সাজা প্রদান করেছেন, তা হয়তো জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ভালো বলতে পারবে। আপনি সেখানে যোগাযোগ করে দেখতে পারেন।’ 

সদ্য প্রত্যাহার হওয়া কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনকে মোবাইলে এসএমএস এবং একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ না করায় এ বিষয়ে কোনও বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। 

বিশ্বনাথ নম দাসের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগে পেনাল কোডের ১৮৮ ও ১৮৯ ধারায় বিশ্বনাথ নম দাস ও খালেকুজ্জামান মজনুকে মোবাইল কোর্টে সাজা দেন আরডিসি নাজিম উদ্দিন। যদিও ১৮৮ ধারায় সাজা প্রদানের সাকুল্যে ক্ষমতা এক মাস থেকে ছয় মাস পর্যন্ত। কিন্তু আইনের ব্যত্যয় ও স্পষ্ট লঙ্ঘন ঘটিয়ে বিশ্বনাথ নম দাসকে এক বছর সাজা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অপর ধারায় ১১ মাস এক দিন সাজা দেন। এসবই ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রতিশোধ নিতেই মধ্যরাতে এই মোবাইল কোর্ট করা হয়েছে।’
/বাংলা ট্রিবিউন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য