দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশব্যাপী সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দুর্ভোগের বিষয়টি মাথায় রেখে সরকারি ভবনের পাশাপাশি গ্রামগঞ্জের হাটবাজারের ছাদগুলোতেও সোলার প্যানেল বসানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশীয় শিল্প গড়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে। সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, কেবল এবং রক্ষণাবেক্ষণ খাতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হবে। বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিবছরই বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় বৃদ্ধি ও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশীয়ভাবে সহজলভ্য সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করাকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ জানান, দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং বড় প্রকল্পের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণেও জোর দেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ চাহিদা নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা স্রেডাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটের বেশি হয়েছে, যার বড় অংশই সৌরবিদ্যুৎ। স্রেডার চেয়ারম্যান মোজাফফর আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের অপার সম্ভাবনা রয়েছে এবং রুফটপ সোলার ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে অতিরিক্ত জমি ব্যবহার ছাড়াই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। তিনি জানান, ২০২৫ সালে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির আওতায় সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানার ছাদ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহকরা নিজস্ব ব্যবহারের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার সুযোগ পাচ্ছেন। এছাড়া শিল্পকারখানার ছাদ ব্যবহার করে দিনের বেলার বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমানো সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম জানান, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় সঞ্চালন অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে এবং বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা এবং অর্থায়নের সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এ খাতে আরও বড় বিনিয়োগ আসা সম্ভব। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান উল্লেখ করেন, সৌরবিদ্যুৎ সূর্যালোকের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় যুক্ত করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের গত মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ৭৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট এবং গ্রিডের বাইরে রয়েছে ৩৭৭ দশমিক ১৭ মেগাওয়াট, যার মোট স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৪৫০ দশমিক ৬৭ মেগাওয়াট। আগামী পাঁচ বছরে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে দেশব্যাপী সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ভবনের ছাদ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।



0 মন্তব্যসমূহ