আব্দুল আলীম নোবেল: কক্সবাজারে ডিজিটাল ভূমি জরিপ (বিডিএস) ও দিয়ারা জরিপ কার্যক্রম ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে তসদিক পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা মো. মতিউর রহমানকে ঘিরে ভূমি মালিকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। তাঁর চলাফেরা, কথিত সহযোগীদের তৎপরতা, হোটেলে অবস্থান এবং ভূমি মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগের ধরন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তাকে ঘিরে সক্রিয় রয়েছে একটি কথিত ‘সিন্ডিকেট’। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভূমি মালিকদের বিভিন্ন কাজ দ্রুত করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অর্থ দাবি করা হচ্ছে এমন অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
তবে এসব অভিযোগের সবকটির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অন্যান্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যও নেওয়া প্রয়োজন।
সরকারি কর্মকর্তা, চলাফেরায় বেসরকারি গাড়ি
স্থানীয়দের দাবি, মতিউর রহমান প্রতিদিন সকালে একটি সাদা রঙের জিপে করে অফিসে আসেন। গাড়িটিতে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের স্টিকার রয়েছে। তাঁকে অফিসে নামিয়ে দেওয়ার পর গাড়িটি কখনো আশপাশে অপেক্ষা করে, আবার কখনো অফিস ছুটির আগেই এসে হাজির হয়।
এরপর ওই গাড়িতেই তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর অবস্থান করা আবাসিক হোটেলে।
দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের দৃশ্য দেখা যাওয়ায় স্থানীয়দের প্রশ্ন সরকারি একজন কর্মকর্তা নিয়মিত ওই গাড়ি ব্যবহার করছেন কেন? গাড়িটির মালিক কে? বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সঙ্গে গাড়ির সম্পর্ক কী? আর ওই গাড়ির সঙ্গে মতিউর রহমানের সম্পর্কই বা কী?
হোটেলে অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, তসদিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে মতিউর রহমান তাঁর কথিত কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে কক্সবাজার শহরের একটি বিলাসবহুল হোটেলে অবস্থান করছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, হোটেলের একটি সুইট কক্ষের দৈনিক ভাড়া প্রায় ৫ হাজার টাকা।
প্রশ্ন উঠেছে দীর্ঘদিনের এই আবাসনের ব্যয় কে বহন করছেন? সরকারি দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে হলে এর সরকারি অনুমোদন রয়েছে কি না, আর ব্যক্তিগত হলে ব্যয়ের উৎস কী তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
কারা ঘুরছেন কর্মকর্তার আশপাশে?
ভূমি মালিকদের কয়েকজনের অভিযোগ, শাহিনুজ্জামান, রুবেল, বাবুল, সাদ্দামসহ কয়েকজন ব্যক্তি নিয়মিত জরিপ কার্যক্রমের আশপাশে অবস্থান করেন এবং ভূমি মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব ব্যক্তির কেউ কেউ ভূমি মালিকদের বিভিন্ন কাজ দ্রুত করে দেওয়ার কথা বলে অর্থের বিষয়ে কথা বলেন।
তবে তাঁরা সরকারি কর্মচারী নাকি ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত এ বিষয়টিও স্পষ্ট নয়। তাঁদের সরকারি দায়িত্ব বা অনুমোদিত ভূমিকা থাকলে তার নথি প্রকাশ করা প্রয়োজন।
‘প্রতি টেবিল থেকে দুই লাখ টাকা’অভিযোগ
অনুসন্ধানে কয়েকজনের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, জরিপ কার্যক্রমের বিভিন্ন টেবিল থেকে মাসিক অর্থ দেওয়ার একটি অলিখিত ব্যবস্থা রয়েছে। কোথাও কোথাও প্রতি টেবিল থেকে মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
তবে এই অভিযোগের পক্ষে ব্যাংক লেনদেন, রসিদ, অডিও-ভিডিও বা লিখিত নথি ছাড়া এটিকে নিশ্চিত ঘটনা বলা যাচ্ছে না। অভিযোগটির সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট টেবিলের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ভূমি মালিকদের বক্তব্য নেওয়া জরুরি।
‘৫-১০ হাজারে খতিয়ান সই নয়’ ভূমি মালিকদের অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের কয়েকজনের অভিযোগ, খতিয়ান সইসহ বিভিন্ন কাজের জন্য ছোট অঙ্কের টাকা গ্রহণ করা হচ্ছে না; বরং বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ‘৫-১০ হাজার টাকায় খতিয়ান সই করি না, ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা দিতে হবে’ এমন বক্তব্যও নাকি দেওয়া হয়েছে।
এই বক্তব্য কে দিয়েছেন, কখন দিয়েছেন এবং কার কাছে বলেছেন তা নিশ্চিত করতে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে আরও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
সাবেক সার্ভেয়ার শফিকুরের পুরনো অভিযোগ
বিডিএস অফিসের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে উঠে এসেছে সাবেক সার্ভেয়ার শফিকুর রহমানের নামও।
অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর সময়েও ভূমি মালিকদের বিভিন্ন সেবা নিয়ে হয়রানি এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ছিল। এমনকি একজন সেবাপ্রার্থীর কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের কথাও অনুসন্ধানে এসেছে।
তবে এই ১২ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নথি ও প্রমাণ যাচাই করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ দাবি করছেন, শফিকুর রহমান বদলি হওয়ার পরও তাঁর সময়কার কথিত দালালনির্ভর সংস্কৃতি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
‘হুইপের ভাতিজা’ পরিচয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
মতিউর রহমান নিজেকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির আত্মীয় পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করেন এমন অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।
ফলে এটি অভিযোগ হিসেবেই উল্লেখ করা হচ্ছে; সত্যতা যাচাই ছাড়া বিষয়টিকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে দাবি করা হচ্ছে না।
সপ্তাহে একদিন অফিস এমন অভিযোগও রয়েছে
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রায় ৩০টি সিটের দায়িত্বে থাকা মতিউর রহমান নিয়মিত অফিস করেন না। এমনকি সপ্তাহে মাত্র একদিন অফিসে উপস্থিত থাকার অভিযোগও রয়েছে।
যদি এ অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তাঁর দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার ভূমি মালিকদের সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা তদন্তের বিষয়।
এ বিষয়ে অফিসের হাজিরা খাতা, দায়িত্ব বণ্টনের আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সরকারি কর্মসূচির নথি পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
ভূমি জরিপের সঙ্গে মানুষের জমির মালিকানা ও ভবিষ্যৎ অধিকার সরাসরি জড়িত। তাই জরিপ কার্যক্রমে ঘুষ, দালাল, হয়রানি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করুক। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে অভিযুক্তদেরও দায়মুক্তির সুযোগ দেওয়া হোক।
এই বিষয়ে বিডিএস জরিপের ডিজি হুমায়ুন কবির বলেন, আপনার কাছে প্রমাণ থাকলে আমার নাম্বারে দেন প্রমাণ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নিবো।
অপর দিকে সার্ভেয়ার শফিক ও মতিউর রহমানের সাথে ফোনে বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিক চেষ্টা করেও ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কক্সবাজারে ডিজিটাল ভূমি জরিপ ঘিরে ঘুষ, কথিত সিন্ডিকেট, দালাল তৎপরতা ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।



0 মন্তব্যসমূহ