বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি উপজেলায় ‘আলোকিত সন্তান’দের তালিকা প্রকাশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমাজে মর্যাদা নির্ধারণের মানদণ্ড নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। ওই তালিকায় জীবিত ব্যক্তিদের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের নাম ওপরের দিকে থাকায় এই আলোচনার সূত্রপাত হয়। বিষয়টি নিছক স্থানীয় তালিকা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বরং বাংলাদেশে ‘আলোকিত মানুষ’ হিসেবে কাকে গণ্য করা হবে—যার ক্ষমতা বেশি নাকি যার অবদান বেশি—সেই মৌলিক প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, উন্নত গণতান্ত্রিক সমাজে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সামাজিক সম্মান সবসময় এক নয়। আইপসোস-এর ২০২৪ সালের গ্লোবাল ট্রাস্টওয়ার্দিনেস ইনডেক্স অনুযায়ী, ৩২টি দেশের গড়ে ৫৮ শতাংশ মানুষ চিকিৎসক, ৫৬ শতাংশ বিজ্ঞানী এবং ৫৪ শতাংশ শিক্ষককে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন। বিপরীতে রাজনীতিকদের ওপর আস্থার হার মাত্র ১৫ শতাংশ। একইভাবে ২০২৫ সালের গ্যালাপ জরিপেও নার্স, শিক্ষক ও চিকিৎসকরা আস্থার শীর্ষে রয়েছেন।
তবে বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাকেই এখনো মর্যাদার প্রধান উৎস হিসেবে দেখা হয়। সচিব, ডিসি বা পুলিশ কর্মকর্তাদের পরিচয় সামাজিক অবস্থান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। এর পেছনে ঔপনিবেশিক আমলের প্রশাসনিক কাঠামোর প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়। যদিও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের এক জরিপে দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন প্রশাসন সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ নয় এবং ৬৬ শতাংশের মতে কর্মকর্তারা শাসকের মতো আচরণ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষক, গবেষক, লেখক বা সাংবাদিকদের মতো পেশাজীবীরা সরাসরি প্রশাসনিক ক্ষমতা না রাখলেও সমাজ ও মানুষের চিন্তা পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখেন। তাই ‘আলোকিত সন্তান’ নির্বাচনে শুধু পদমর্যাদা নয়, বরং জ্ঞান, সৃজনশীলতা, সততা এবং মানুষের জন্য রেখে যাওয়া কাজকেই প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। একটি জনপদের প্রকৃত আলো শুধু প্রশাসনিক ভবন থেকে নয়, বরং শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প ও সমাজসেবামূলক কাজের মাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে আলোকিত মানুষ বলতে কি শুধু ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের বোঝায়? উত্তরবঙ্গের একটি উপজেলার তালিকা ঘিরে উঠেছে প্রশ্ন। জ্ঞান, সততা ও অবদানের ভিত্তিতে মর্যাদা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত।



0 মন্তব্যসমূহ