মো. সাদিকউর রহমান শাহ্ স্কলার, রংপুর ব্যুরোঃ নীলফামারী সদর উপজেলার কুন্দপুকুর ইউনিয়নের আংগারপাড়া (বড়বাড়ি) এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রায় ২৮ লাখ টাকার একটি জরুরি উন্নয়নমূলক কাজ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ইছামতী নদী ও নদীসংলগ্ন জমি থেকে স্কাভেটর (ভেকু) দিয়ে বালু উত্তোলন করে স্থানীয় একটি খেলার মাঠ ভরাটের অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। তাঁদের দাবি, এভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তীর, পরিবেশ ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঠিকাদারি কাজ নিয়ে প্রশ্ন স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কাজী আক্তারুজ্জামান জুয়েলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে ছোট ডাবলুর ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কাজ করে আসছেন। এর আগেও চাড়ালকাটা নদীর তীররক্ষা বাঁধের কাজে ড্রেজিং মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নেওয়ার গুঞ্জনও স্থানীয়ভাবে রয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অনুমতি ছাড়া জমি থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ
কুন্দপুকুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক বিএনপি সভাপতি আব্দুস শহীদ বলেন, মাঠ ভরাট কিংবা নদীর ধারসংলগ্ন এলাকায় কাজের বিষয়ে স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মী ও এলাকাবাসীর অনেকেই অবগত নন। তাঁর দাবি, নিয়ম অনুযায়ী বাইরে থেকে বালু এনে কাজ করার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।
স্থানীয় জমির মালিক মো. আবু বক্কর সিদ্দিক অভিযোগ করে বলেন, “ঠিকাদার আমাদের অনুমতি ছাড়াই জমি থেকে বালু উত্তোলন করছেন। আমার ভাতিজা ফোন করে বালু উত্তোলন করতে নিষেধ করলে ঠিকাদার তাঁকে হুমকি দিয়েছেন।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থেকে বালু উত্তোলনের ফলে প্রকল্পের কাজের স্বচ্ছতা, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাঁরা বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
ঠিকাদারের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে সাবঠিকাদার হিসেবে পরিচিত কাজী আক্তারুজ্জামান জুয়েলের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “এটা আমার কাজ। আমি কোথা থেকে বালু তুলে কাজ করব, সেটা আমার ডিপার্টমেন্ট (পানি উন্নয়ন বোর্ডে) দেখবে।”
অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিল আটকে দেওয়ার আশ্বাস পাউবোর
অভিযোগের বিষয়ে নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রেজা আহমেদ বলেন, নদী থেকে স্কাভেটর দিয়ে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রকল্পের প্রাক্কলনে এভাবে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, “কাজ নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করে বিল দেওয়া হবে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে এবং কাজের মান যথাযথ না থাকলে বিল পুরোপুরি আটকে দেওয়া হবে।”
তদন্তের আশ্বাস প্রশাসনের
নীলফামারী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুবাশ্বিরা আমাতুল্লাহ জানান, অবৈধ বালু উত্তোলন প্রতিরোধে প্রতিটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান ও গ্রাম পুলিশদের নিয়ে নির্দিষ্ট কমিটি গঠন করা রয়েছে।
অন্যদিকে, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোছা. মলি আক্তার জানিয়েছেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুষ্ঠু তদন্তের দাবি
প্রায় ২৮ লাখ টাকার সরকারি প্রকল্পে বালু উত্তোলনের উৎস, জমির মালিকের অনুমতি, প্রকল্পের প্রাক্কলন এবং কাজের বাস্তব মান যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার ও নদী-পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।



0 মন্তব্যসমূহ