শিশুদের অপরাধবোধ ও মানসিক ভীতির মধ্য দিয়ে বড় করার বিষয়টি অনেক সময় ধর্মীয় পরিবেশে দেখা যায়। একটু ভুল হলেই সন্তানকে বলা হয় যে সে পাপ করেছে এবং আল্লাহ তার ওপর কষ্ট পেয়েছেন কিংবা ফেরেশতারা লজ্জা পাচ্ছেন। অনেক ধর্মীয় বক্তাও এমন কথা বলে থাকেন যে মানুষ অপরাধ করলে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে। বাহ্যিকভাবে এসব কথা পাপ থেকে দূরে রাখার কৌশল মনে হলেও এর পেছনে চিন্তাগত ভ্রান্তি রয়েছে। ইসলামে আল্লাহর অসীম অমুখাপেক্ষিতার কথা বলা হয়েছে। মানুষের ভালো কাজ বা ইবাদতের যেমন আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই, তেমনি মানুষের অপরাধ বা অমান্যতায় তাঁর কোনো ক্ষতি হয় না। পুরো মানবজাতি ধার্মিক বা পাপাচারী যাই হোক না কেন, তাতে আল্লাহর ক্ষমতার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটে না। ইমাম গাজালি উল্লেখ করেছেন যে বিশ্বজগতের সমস্ত উপাসনা ও ইবাদতের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন মহান আল্লাহ। মানুষের ইবাদত তাঁর কোনো প্রয়োজন মেটায় না, বরং তা বান্দার নিজের আত্মার সুস্থতা ও শান্তির খোরাক। পাপের প্রকৃত সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, পাপ কোনো আবেগাক্রান্ত সত্তার মেজাজ খারাপের বিষয় নয়; বরং পাপ হলো এমন সব কাজ, যা মানুষের নিজের, তার পরিবারের কিংবা সামাজিক শান্তির জন্য ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক। মদ্যপান, জুয়া, ব্যভিচার, চুরি বা অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যাকে ইসলামে মহাপাপ বলা হয়েছে, কারণ দীর্ঘমেয়াদে এগুলো পারিবারিক অশান্তি, শারীরিক ব্যাধি, আর্থিক দেউলিয়াত্ব এবং সামাজিক বিভেদ ডেকে আনে। মানুষ নিজের শরীর বা আত্মাকে ক্ষতিকর কাজে লিপ্ত করে ধ্বংস করার অধিকার রাখে না, কারণ জীবনের অস্তিত্বের জন্য প্রাকৃতিকভাবে স্রষ্টার ওপর নির্ভর করতে হয় এবং শরীরের প্রকৃত মালিক মহান আল্লাহ। কুফর বা শিরক প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, স্রষ্টাকে অস্বীকার করা বা অন্য কোনো সৃষ্টিকে স্রষ্টার আসনে বসানো মানুষকে জীবনের মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করে এবং তা আত্মার প্রতি করা সবচেয়ে বড় অবিচার। কোনো আচরণ বা কাজ পাপ কি না, তা যৌক্তিকভাবে নির্ধারণের মাপকাঠি হলো ইসলামি বিধানের মূল লক্ষ্য বা জনকল্যাণ। ইমাম আল-গাজালি এবং তাহির ইবনে আশুরের মতে, মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক ক্ষতি রোধ করা এবং ধর্ম, জীবন, প্রজনন, সম্পদ ও বিবেকের মতো পাঁচটি মৌলিক বিষয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই ইসলামি বিধানের মূল লক্ষ্য। ইসলাম মানুষকে ফেরেশতাতুল্য নিখুঁত সত্তা হিসেবে দেখে না এবং মানুষের প্রবৃত্তি ও ভুলের ঝোঁক রয়েছে। কোনো ভুল বা পাপ হয়ে যাওয়ার অর্থ জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কোরআন ও হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, কোনো বান্দা ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত চিত্তে তওবা করলে আল্লাহ অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন।
শিশুদের অপরাধবোধ ও ভীতি দেখিয়ে বড় করার ধর্মীয় ধারণার বিপরীতে ইসলামে পাপের প্রকৃত অর্থ, আল্লাহর অমুখাপেক্ষিতা এবং তওবার সুযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা।



0 মন্তব্যসমূহ