হাওড়, নদী ও পাহাড়ের সমন্বয়ে গঠিত মৌলভীবাজার জেলা একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানকার অনুকূল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আবহাওয়া এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের আতিথেয়তা পর্যটকদের নিরাপদ বিচরণের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ঋতুভেদে মৌলভীবাজারের প্রকৃতির রূপ পরিবর্তন হয়। গ্রীষ্মের তাপদাহ থেকে শুরু করে বর্ষার সবুজের গালিচা, হাওরের জলরাশি কিংবা শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন হিমশীতল আবহাওয়া এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে। পর্যটকদের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে স্থানীয় যুবসমাজ বিভিন্ন ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে এবং অর্থনীতিতে পর্যটন খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রায় দুই হাজার ৭৯৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই জেলায় দেশের সর্বোচ্চ ৯৩টি চা বাগান রয়েছে, যার কারণে একে চায়ের রাজধানী বলা হয়। দেশের সর্ববৃহৎ হাকালুকি হাওড়ের প্রায় ৭০ শতাংশ এই জেলায় অবস্থিত। এছাড়া জেলার ১৫টি নদীর মধ্যে মনু, ধলাই, কুশিয়ারা, ফানাই, জুড়ী ও সোনাই নদীসহ ৯টি সচল নদী পর্যটনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। মাধবকুণ্ড, পরীকুণ্ড এবং হামহাম জলপ্রপাত মৌলভীবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলাকে কেন্দ্র করে জেলার পর্যটন শিল্পের বিকাশ সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। পর্যটকদের আবাসন নিশ্চিত করতে উন্নতমানের হোটেল, মোটেল ও প্রায় দুই শতাধিক রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। শ্রীমঙ্গলের চা গবেষণা কেন্দ্রের রেস্টহাউস, চা জাদুঘর, গ্র্যান্ড সুলতান অ্যান্ড টি রিসোর্ট এবং দুসাই রিসোর্ট পর্যটকদের সেবা দিয়ে আসছে। দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেইক, বাইক্কাবিল, বর্ষিজোড়া ইকো-পার্ক এবং বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর পল্লি। ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে রয়েছে সৈয়দ শাহ মোস্তফা (রহ.)-এর মাজার, খোজার মসজিদ, লাল দুর্গা মন্দির এবং বিষ্ণুপদ ধাম। শমসেরনগর বিমানবন্দর চালু এবং পর্যটকদের জন্য ট্রেনে বিশেষ বগির দাবি জানিয়েছেন মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম নাসের রহমান। তিনি জাতীয় সংসদে এসব দাবি উত্থাপন করলে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় কাজ করছে বলে জানানো হয়। উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান শফিক আলম মেহেদী এক অনুষ্ঠানে মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা হিসেবে ঘোষণা করলেও আজও এ সংক্রান্ত কোনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। পরবর্তীতে ২০০৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটন মন্ত্রণালয় বরাবর একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। এছাড়া গত ১৭ জুন শ্রীমঙ্গলের জনসভায় প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী পর্যটন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি জানান। ২০১০ সালের আইন অনুযায়ী সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পর্যটন সংরক্ষিত এলাকা ও বিশেষ পর্যটন অঞ্চল ঘোষণা করতে পারে।
হাওড়, নদী ও পাহাড়ঘেরা মৌলভীবাজারে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা থাকলেও ২০০৮ সালের ঘোষণার পর আজও কোনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি।



0 মন্তব্যসমূহ