১৯৭৩ সালে নেদারল্যান্ডসের লাইডেন গবেষণাগারে তরুণ গবেষক ফ্রাঙ্ক গ্রাহাম মানুষের কিডনি কোষ নিয়ে কাজ করার সময় এক অভাবনীয় সাফল্য পান। তার ২৯৩তম পরীক্ষায় একটি ভ্রূণের কিডনি কোষে অ্যাডিনোভাইরাসের ডিএনএ প্রবেশ করিয়ে তিনি সেগুলোকে অমর করে তোলেন, যা আজ ‘HEK 293’ নামে পরিচিত। আণবিক জীববিজ্ঞানের এই বিস্ময়কর কোষগুলো গত ৫০ বছর ধরে গবেষণাগারে নিরন্তর বিভাজিত হয়ে চলেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ কোষ বিভাজনের সময় ক্রোমোজোমের প্রান্তে থাকা ‘টেলোমিয়ার’ ক্ষয়ে গিয়ে কোষ মারা যায়। কিন্তু HEK 293 কোষগুলো টেলোমারেজ এনজাইম সক্রিয় করার মাধ্যমে এই ক্ষয় রোধ করে অমরত্ব লাভ করেছে। তবে এই অমর কোষগুলোরও একটি দুর্বলতা রয়েছে—একাকিত্ব। গবেষণাগারে পর্যাপ্ত পুষ্টি ও অনুকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও যদি একটি কোষকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা হয়, তবে সেটি আর বিভাজিত হয় না এবং মারা যায়। বিজ্ঞানীরা একে ‘প্যারাক্রাইন সংকেত’ হিসেবে অভিহিত করেন, যেখানে কোষগুলো একে অপরকে বেঁচে থাকার ও বিভাজিত হওয়ার রাসায়নিক আশ্বাস দেয়।
জার্মান বিজ্ঞানী আউগুস্ট ভাইসমান ১৮৮৫ সালে কোষকে দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন—জননকোষ ও দেহকোষ। দেহকোষগুলো এক নিঃস্বার্থ চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের বিলীন করে দিয়ে জননকোষকে পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দেয়। মানুষের শরীরের ৩০ ট্রিলিয়ন কোষ ঠিক এভাবেই একটি সুশৃঙ্খল সভ্যতার মতো কাজ করে। শ্বেত রক্তকণিকা থেকে শুরু করে নিউরন পর্যন্ত প্রতিটি অংশই যেন এক একটি দক্ষ বিভাগ। গবেষকদের মতে, মানুষের তৈরি সমাজ, প্রশাসন বা প্রযুক্তি আসলে শরীরের ভেতরে ঘটে চলা এই জটিল প্রক্রিয়ারই এক স্থূল প্রতিফলন। এই কোষীয় সভ্যতা আমাদের শেখায় যে টিকে থাকা কেবল একক প্রচেষ্টায় নয়, বরং সম্মিলিত ঐক্যের ওপর নির্ভরশীল।
১৯৭৩ সাল থেকে গবেষণাগারে অমর হয়ে আছে HEK 293 কোষ। তবে পর্যাপ্ত খাবার থাকলেও একাকিত্বে মারা যায় এই কোষগুলো। কোষের এই সামাজিক আচরণ ও টিকে থাকার লড়াই নিয়ে আমাদের বিশেষ প্রতিবেদন।



0 মন্তব্যসমূহ