কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নে অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি ও অব্যাহত গোলাগুলির ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে পাহাড়ঘেঁষা নোয়াখালী জুম্মাপাড়া ও কচ্ছপিয়া এলাকায় আতঙ্ক এতটাই বেড়েছে যে, শতাধিক পরিবার নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রোহিঙ্গা ও স্থানীয় সশস্ত্র চক্রের সমন্বয়ে গঠিত কয়েকটি গোষ্ঠী এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত।
ভুক্তভোগী খালেদা বেগম জানান, গত ২৮ জুন রাতে তার বাড়ির চারপাশে দীর্ঘক্ষণ গোলাগুলি হয় এবং একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা দরজায় গুলি ও লাথি মারে। প্রাণের ভয়ে তিনি বর্তমানে মেয়েকে নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। একই এলাকার পল্লী চিকিৎসক কামাল উদ্দিনকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করা হয়েছিল, যিনি মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এলেও নির্যাতনের কারণে এখনো অসুস্থ। গত ১৭ জুলাই উত্তর নয়াপাড়া থেকে ১২ বছর বয়সী শিশু আরাফাতকে অপহরণ করে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়, পরে ৪ লাখ টাকার বিনিময়ে সে মুক্তি পায়। এছাড়া গত মে মাসে অপহৃত হয়ে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইমরান। গত ৩ মে নোয়াখালীপাড়া এলাকায় অপহরণ চেষ্টার সময় শহীদ উল্লাহ নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন এবং এপ্রিলে সুমাইয়া নামে এক তরুণী গুলিতে নিহত হন। একই সময়ে পাহাড় থেকে কয়েকজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
বাহারছড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোহাম্মদ ইলিয়াছ জানান, তার ওয়ার্ডের অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি পরিবার এলাকা ছেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা রুবী আক্তার ও নাজমা আক্তার জানান, রাতের বেলা গোলাগুলির শব্দে তারা চরম আতঙ্কে থাকেন। জননিরাপত্তার কথা ভেবে মোহাম্মদ শাকের তার পরিবারকে টেকনাফ পৌরসভায় সরিয়ে নিয়েছেন। পান ব্যবসায়ী মো. সাব্বির জানান, মানুষ এখন জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত তিন বছরে টেকনাফের পাহাড়ঘেঁষা এলাকা থেকে অন্তত ৩২০ জন অপহৃত হয়েছেন।
বাহারছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকন দ্রুত যৌথ অভিযানের দাবি জানিয়েছেন। কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, টেকনাফকে অপরাধমুক্ত করতে সব বাহিনীর সমন্বয়ে দ্রুত অভিযান শুরু হবে। জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান ও পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান জানান, অপহরণপ্রবণ এলাকায় টহল জোরদার ও যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী ও উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার অপরাধীদের দমনে কঠোর ব্যবস্থার কথা জানিয়েছেন। টেকনাফ মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম ও উখিয়া থানার ওসি আতিকুল রহমান জানান, সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে পুলিশের বিশেষ টিম কাজ করছে।
টেকনাফের বাহারছড়ায় অপহরণ ও গোলাগুলির আতঙ্কে ঘর ছাড়ছে শত শত পরিবার। মুক্তিপণ আর সহিংসতার হাত থেকে বাঁচতে পাহাড়ঘেঁষা জনপদ এখন প্রায় জনশূন্য। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন।



0 মন্তব্যসমূহ