কক্সবাজার সদর হাসপাতালের অবকাঠামোর উন্নতি হলেও কমেছে সেবার মান বেড়েছে দুর্নীতি

এন এ আজাদঃ 
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের পারিপার্শ্বিক অবকাঠামো সহ আউডডোর ইনডোর ও বিভিন্ন ওয়ার্ডের বেশ উন্নতির ছোয়া লাগলেও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কক্সবাজার জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হাসপাতালে সেবা নিতে আসা অসহায় গরীব পরিবারের লোকজনেরা। সরকারী হাসপাতাল হিসাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধিনে সরকারী বরাদ্ধ থেকে বিভিন্ন প্রকার ঔষধ, গজ বেন্ডিজ, তুলা সহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন টেস্ট পরীক্ষার পর্যাপ্ত সরঞ্জাম দেওয়া হলেও হাসপাতালে ভর্তিরত রোগীরা সঠিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এমন অনিয়ম ও দুর্নীতি করা হলেও যেন দেখার কেউ নেই।

কক্সবাজার সদরের ঈদ্গাঁও ইউনিয়ন থেকে সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা তসলিমা বেগম নামের এক রোগী জানান, কিছুদিন পূর্বে তার ছেলে ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত হলে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের ৪র্থ তলায় শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হলেও কোন প্রকার সরকারী দেয়া ঔষধ না দিয়ে হাসপাতালে কর্মরত নার্সরা ইন্টার্নি ডাক্তাদের পরামর্শ মতে টুকেনের মাধ্যমে বাহিরের ফার্মাসি থেকে সমস্ত ঔষধ ক্রয় করান। অথচ সরকারের দেয়া কোটি কোটি টাকার ঔষধ হাসপাতালে ভর্তিরত রোগিদেরকে না দিয়ে এসব ঔষধ কোথায় যায় এমন প্রশ্ন চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগীদের।

সরেজমিনে তদন্ত করে পুরো হাসপাতালের একাধিক ভর্তিরত রোগীদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, কিছু কিছু নার্স রোগীদের সেবা না দিয়ে নিজেদের মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যাতিব্যস্ত থাকেন সবসময়। কোন রোগী চিকিৎসা সেবা নিয়ে তাদের সাথে আলাপ করতে গেলে কর্কট ভাষায় জবাব দেয়। তারা আরো বলেন, সরকারী বেতনভুক্ত নিয়োগকৃত ডাক্তারেরা সেবা না দিয়ে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে পড়ুয়া ছাত্র ও ইন্টার্নি ডাক্তারদের মাধ্যমে সমস্ত রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করেন। নিয়োগপ্রাপ্ত ডাক্তারেরা নিজেদের পার্সোনাল চেম্বার নিয়ে ব্যাতিরস্ত থাকায় হাসপাতালে ভর্তীরত রোগীদের ঠিক মত দেখবাল করেন না। এসব ডাক্তাররা হাসপাতালে আসলেও তত্ত্বাবধায়ক ও আরএমও কক্ষে আলাপরত ও অলস সময় কাটিয়ে দুপুর ২ টার আগেই হাসপাতাল ত্যাগ করেন। এতে রোগীরা সঠিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে হারহামেশাই।

জানা গেছে, ২৫০ শয্যার আধুনিক এই হাসপাতালের সরকারী বরাদ্ধের এমএসআর এর মালামালের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার ঔষধ, গজ বেন্ডিজ, তুলা সহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দেওয়ার জন্য রাজধানী ঢাকার ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান জামান ট্রেডার্সকে টেন্ডারের মাধ্যমে নিয়োগ করা হয়। তারা মূলত সারা বছর প্রয়োজন অনুসারে এসব মালামাল সরবরাহ করে আসছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, বছরে এ হাসপাতালের জন্য প্রায় ৭ কোটি টাকার সরকারী বরাদ্ধকৃত মালামালের মধ্যে এখনো প্রায় ২ কোটি টাকার মালামাল দেয়নি উক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্টানটি। তবুও গত জুন মাসের শেষ হিসাবে বরাদ্ধ হওয়া টাকা উত্তোলনের জন্য বকেয়া থাকা প্রায় সোয়া ২ কোটি টাকার মালামাল বুঝে না নিয়ে শুধু মাত্র ঠিকাদারের দেওয়া পে-অর্ডারের উপর ভিত্তি করে বিল আদায়ের জন্য ট্রেজারীতে পাঠিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু উক্ত মালামাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গ্রহণ না করেও মালামাল বুঝে পেয়েছে মর্মে সার্ভে কমিটির সভাপতি হিসাবে সার্জারী বিভাগের ডাঃ শাহ আলম স্বাক্ষর করেছেন বলে স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়। এছাড়া ঐ সার্ভে কমিটিতে রয়েছেন আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ শাহীন আবদুর রহমান এবং মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ শামসুদ্দীন। 
সুত্রে প্রকাশ, জামান ট্রেডার্স নামীয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সাথে রয়েছে বিএনপি সরকারের সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাউদ্দিনের আর্শিবাদপুষ্ট কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের পেকুয়া সমিতির প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দহরম মহরম সম্পর্ক। হাসপাতালে ষ্টোর কীপার হয়েও নিজ বেতনে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসাবে দায়িত্বরত গোলম মোরশেদ ও সহোদরদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে হাসপাতালের সরকারী বে-সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। গোলাম মোরশেদের ছোট ভাই মাঈন উদ্দিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ হার্বাল বিভাগের অধীনে হাসপাতালে বে-সরকারী বাগানমালী হিসাবে নিয়োগ পেলেও মূলত অফিস সহকারী হিসাবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। 

এছাড়াও কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের ইন্টার্নি করা ডাক্তারদেরও অফিস সহকারী (বাগানমালী) মাঈন উদ্দিনকে স্যার বলতে হয়। স্যার না বললে তিনি ইন্টার্নি করা ডাক্তারদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ অজয় ঘোষের আমলে নিয়োগ পাওয়া এই বাগানমালী মাঈন উদ্দিন সদ্য বদলী হওয়া হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ পুচনু'কে মোটা অংকের মাসিক মাসোহারা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অফিস সহকারীর অবৈধ দায়িত্বে রয়েছেন। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের দায়িত্বরত কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জানান, বাগানমালীকে অফিস সহকারীর দায়িত্ব দেওয়ার কোন বিধান নেই। যা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা বিরোধী। এমনকি বাগানমালী পদের কোন 
পদোন্নতির নিয়মও নেই বলে জানান তারা। সরকারী হাসপাতালের শোভাবর্ধনে বাগান পরিচর্যার জন্য মাঈন উদ্দিনকে হারবাল বিভাগ থেকে বাগানমালী হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হলেও সেখানে বাগানের কোন অস্থিত্ব নেই। অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, জোট সরকারের সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাউদ্দিনের আর্শিবাদপুষ্ট কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের পেকুয়া সমিতির সিন্ডিকেটের সদস্যরা এতই প্রভাবশালী যে, কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পান না। 

জানা গেছে, হাসপাতালের নিজ বেতনে প্রশাসনিক কর্মকর্তা গোলাম মোরশেদ ও তার দুই ভাই বাগানমালী মাঈন উদ্দিন এবং বে-সরকারী ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত টিকেট কাউন্টারের মহি উদ্দিন সহ মামা-ভাগিনা অফিস সহকারী এস্তফিজ ও ওয়ার্ড মাষ্টার নোমান, ষ্টোর কীপার কালাম মোস্তাকিম, গোলাম মোরশেদের শালা যুবলীগ কর্মী পরিচয়ী শহিদুল্লাহ ও তার ছোট ভাই এরশাদ উল্লাহ'রাই পুরো হাপাতালের সবকটি বিভাগের নিয়ন্ত্রক বলে জানা যায়। দীর্ঘদিন তারা এই হাসপাতালে দায়িত্বে থাকার কারণে ডাক্তার সহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষরা তাদের হাতে জিম্মি রয়েছে বলে সূত্রে প্রকাশ। এছাড়াও আরো জানা যায়, সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ মহি উদ্দিন দায়িত্বগ্রহণের পরপর যুবলীগ কর্মী পরিচয়ী এরশাদ উল্লাহর কাছে হেনেস্তার শিকার হন। ডাঃ মহি উদ্দিন লাঞ্চিত হওয়ার ঘটনায় পুরো হাসপাতালে চরম ক্ষোভ দেখা গেলেও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সেযাত্রায় রফাদফা করেন। কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই আবারও পারিবারিক সিন্ডিকেট চক্রটি তাকে কবজা করে দিনের পর দিন দুর্নীতির অপ্রতিরোধ্য যাত্রাকে আরো বেগমান করে তুলেছেন। আর এই দুর্নীতিবাজদের করাল গ্রাস থেকেই কিছুতেই হাসপাতালের দুর্নীতি অনিয়ম, রোগীদের প্রতি ডাক্তার ও নার্সদের অবহেলা কমছে না।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ মোঃ মহি উদ্দিন এর মুঠোফোনে হাসপাতালের এমন নাজুক পরিস্থিতি ও ডাক্তারদের দায়িত্বের অবহেলা, অনিয়ম আর দুর্নীতি সম্পর্কে জানার জন্য কল দেওয়া হলে তিনি বলেন, ভুক্তভোগী কেউ অভিযোগ দিলে এই বিষয়ে কাউকে কোন প্রকার বিন্দুমাত্র ছাড় দেবেন না। তিনি আরো বলেন, আমি যোগদান করার পর থেকে অতীতের সমস্ত গ্লানি মুচে এই হাসপাতালটিকে আধুনিকতায় রূপান্তর করে জনগনের প্রতি সরকারের দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি। সবার সহযোগিতা ও দোয়ায় এ হাসপাতালকে এগিয়ে নিতে আমি বদ্ধ পরিকর।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য